Pages

Monday, 3 June 2013

বাঙালির পহেলা বৈশাখ


পহেলা বৈশাখ, বাঙলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম দিন। নয়া উদ্যোগের অঙ্গীকার নিয়ে আজকের সূর্যোদয়ের মধ্যে দিয়ে নতুন সনের আগমন। নতুন সূর্যের সামনে বাঙালি আজ প্রণতি রাখবে “জীর্ণপুরাতন যাক ভেসে যাক, মুছে যাক গ্লানী’/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’। অরুণ আলোয় আবহমান এ বাংলার দিক-দিগন্ত উদ্ভাসিত করে আসে নতুন দিন। নবপ্রভাতে বাঙালির জীবনে চারদিকে নতুনের কেতন উড়িয়ে আসে বৈশাখ।
‘আজি এ ঊষার পুণ্য লগনে’ বাঙালির কায়মনো প্রার্থনা: যা কিছু কেদ, গ্লানি পাপ, মূঢ়তা, যা কিছু জীর্ণ-শীর্ণ-দীর্ণ, যা কিছু পুরাতন তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে হোক ছাই। বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক। বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত হোক বাংলার চারদিক। কবিগুরুর সেই চিরায়ত সুর বাঙালির প্রাণে আলোরণ তুলুক: “তোরা সব জয়ধ্বনি কর /তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখীর ঝড়”. . .।
যদিও এটি কোন ধর্মীয় উৎসব নয়। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালীর উৎসব। মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজো আর খ্রীস্টানদের বড়দিন যেমন সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়, তার চেয়েও অনেক বেশি বর্ণাঢ্যভাবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে বাঙালী বরণ করে নেয় বাংলা নববর্ষকে। কারণ এটা বাঙালির এক অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এর প্রধান আকর্ষণ হলো নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরা। তা যেমন-পোশাক ও খাবার দাবারে, তেমনি সাজগোজেও। তাই পয়লা বৈশাখে বাহারি সাজে বাঙালির ঢল নামে পথে, ঘাটে, মাঠে আর মেলায়। এই সাজগোজের প্রস্তুতি কমবেশি থাকে সব ঘরেই। এ েেত্র প্রধান ভূমিকা পালন করে নারীরা। সাজসজ্জায় যে নারীদের উৎসাহ চিরন্তন, তাও সকলের জানা। তাই যে কোন উৎসব এলেই নারীরা নিজেদের সাজাতে ও রাঙাতে হয়ে ওঠেন তৎপর। আর তা যদি হয় নিজস্ব সংস্কৃতির তা হলে তো কোন কথাই নেই। তখন সাজসজ্জায় উঠে আসে নানা বৈচিত্র্য, আর পাল্টে যায় এর আমেজও। বাঙালী জীবন যাত্রায় শুরু হয় পালা গান হয়, পুঁথি পাঠ, যাত্রা গানের আসর। বছরের অন্য মাসে যেমন সারাদিন ভরা েেত কাজ করে সময় কাটাতে হয়, বৈশাখে এসে জীবনের ধারা বদলে যায়। সারাদিন কাজ নয়, উৎসব মুখর জীবন এ জীবনের মাঝেই বাঙালীরা খুঁজে পায় এক নতুন আস্বাদ, নতুন করে জীবন চলার পথের উপাদান, প্রেরণা আর উদ্দীপনা। তাই বাঙালী জীবন এ মাসের গুরুত্ব নিঃসন্দেহে অপরিসীম। জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষ নতুন উদ্যোমে পরবর্তী মাসগুলোর কর্মমুখর জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
কৃষির সঙ্গে বাংলা নববর্ষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সূচনা থেকেই। চিরকাল ঋতুর উপর ভিত্তি করেই হয় ফসলের চাষাবাদ। মোগল সম্রাট আকবর প্রচলন করেন বাংলা সনের। এর আগে মোগল বাদশাহগণ রাজকাজে ও নথিপত্রে ব্যবহার করতেন হিজরী সন। হিজরী চান্দ্র বছর, যা ন্যূনধিক ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয় কিন্তু সৌর বছর পূর্ণ হয় ন্যূনধিক ৩৬৫ দিনে। বছরে প্রায় ১১ দিনের পার্থক্য হওয়ায় হিজরী সন আবর্তিত হয় এবং ৩৩ বছরের মাথায় সৌর বছরের তুলনায় এক বছর বৃদ্ধি পায়। কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে হলে সারাদেশে একটি অভিন্ন সৌর বছরের প্রয়োজন। এই ধারণা থেকেই সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহনের সময় অর্থাৎ ১৫৫৬ খৃস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। আকবরের নবরতœ সভার আমির ফতেউল্লাহ খান সিরাজী বাংলা সন প্রবর্তনের কাজটি সম্পন্ন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলী সন। পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বৈশাখ নামটি নেয়া হয়েছিল নত্র বিশাখার নাম থেকে। হিন্দু পূরাণের তথ্যানুযায়ী দেবী বিশাখার নামের প্রভাবে এই বৈশাখ মাস। ‘বিশাখা হইতে নাম হইল বৈশাখ/আরম্ভিলা গ্রীষ্মকাল প্রখর নিদাঘ/এই মাস হইতে বঙ্গে বর্ষ শুরু হয়/সিদ্ধিদাতা জগানন গণেশ কৃপায়”। বাঙালি হিন্দুদের পূজা পার্বনসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান চাঁদের হিসেব অনুযায়ী হয়। অথচ চন্দ্র পদ্ধতির হিসেব প্রতি সৌর বছরের হিসেব থেকে ১০/১১ দিনের পার্থক্য ঘটে। তাই প্রতি তিন সৌর বছর যখন সাড়ে ৩২ দিনের বেশী হয় তখন বছরের হিসেব থেকে একমাস অতিরিক্ত ধরে মূল হিসেব থেকে বাদ দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। এই অতিরিক্ত মাসকে বলা হয় অতিরিক্ত মাস বা মল মাস। আর সৌর সনের সঙ্গে চন্দ্র মাসের এই মিল করাকে বলা হয় ‘শাবন মিতি’। মল মাসে হিন্দুদের কোন পূজা, পার্বন অথবা বিবাহসহ যে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিধান না থাকলেও মুসলিম সমাজের জন্য এটা কোন সমস্যার ছিল না।
১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের সকল বাঙালি একই দিনে নেচে উঠত বৈশাখের রংয়ের ছটায়। কিন্তু ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে স্বৈর শাসক এরশাদের শাসনামল বাঙলিকে করে দেয় দ্বি-বিভক্ত। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারী থেকে চালু হয় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রণীত বাংলা বর্ষপঞ্জি। বর্তমান চলমান বর্ষপঞ্জী অনুসারে বছরের প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিন হয়। শেষের ৭ মাস ৩০ দিন হয়। (৫ গুণ ৩১ = ১৫৫ দিন, ৭ গুণ ৩০= ২১০ দিন)। ১৫৫ দিন + ২১০ দিন = ৩৬৫ দিন বা এক বছর। লিপইয়ার বা মল বছরে চৈত্র মাস হবে ৩১ দিনে। অর্থাৎ লিপইয়ার বাংলা বছর হয় ৩৬৬ দিনে। লিপইয়ার বলতে সেই বছর বুঝায়, যে বছরকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে নিঃশেষে বিভাজ্য হয়। হারিয়ে যায় সমগ্র বাঙালির এক সাথে নেচে ওঠা। বাঙালি জীবনে দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায় নববর্ষের আবেগ। বিনা প্রশ্নেই মেনে নেয় সব শ্রেণীর মানুষ! স্বৈর শাসক তার স্বৈরাচারী মনোভাব শুধু বাঙালি জীবনের এই অধ্যায়ে চাপিয়ে দিয়েই ্যান্ত হননি, নিজের নিরাপত্তা বিচারে একুশের প্রথম প্রহর নাম দিয়ে রাত ১২টা ১মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের রেওয়াজ চালু করে। অথচ বাঙালি সংস্কৃতি রাত ১২টা ১মিনিটে দিনের প্রথম প্রহর বিবেচনা করে না। আবহমান বাংলার দিনের শুরু প্রত্যুষ আর দিনের অবসান সন্ধ্যা। নাগরিক জীবনে দ্বি-খন্ডিত করে ফেলা হয় একুশের আবেগ। যা আজও চলমান!
বাঙালি জীবনে বাধা-বিপত্তি থাকা সত্বেও, হিম্ কুহেলিকায় ঝরে যাওয়া গাছের পাতা, কোকিলের একটানা উদাসীসুর, মানুষের মনে যখন একরাশ কান্তি এসে ছুঁয়ে যায়, তখন বসন্তরাজ ধীরে ধীরে গাছে গাছে নব-কিশলয়ে, ফসলের মাঠে শস্যদানায় পূর্ণ করে মানুষের মুখে হাঁসি ফুটিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। নেমে আসে উৎসবের ঢল। মেলা বসে গ্রামে-গ্রামে। কত না বিচিত্র্য হাতের তৈরি দ্রব্য সম্ভার সে সব মেলায় বিক্রি হয়। সে সকল জিনিস দেখলে বাঙলার মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবন ধারার একটা স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। গ্রাম বাংলার এ মেলা যেন মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। মাটির পুতুল, খেলনা, পাটের তৈরি শিকা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখা, ঝিনুকের মালা, বাঁশের বাঁশি, পুঁতির মালা, রকমারি মিষ্টান্ন আরো কতনা অদ্ভূত-অদ্ভূত সব জিনিসের সমাবেশ ঘটে সে মেলায়। তাদের জীবন যেন খণ্ড-খণ্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতে কারুকাজে। মানুষ গরীব হতে পারে, দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে তারা জর্জরিত হতে পারে, কিন্তু এসব দুঃখ কষ্ট তাদের জীবনকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। ক্রমান্বয়ে নববর্ষের ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃত হয়। রূপান্তরিত হয় লোকজ উৎসবে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। আধুনিক জীবন-পদ্ধতির নানা উপাচারের সমারোহে খেরো খাতায় হিসাব রাখার প্রচলন এখন উঠেই গেছে। শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা আজ ভুলে যেতে বসেছি, সংস্কৃতির ধারক-বাহক ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই সব লোকজ খেলা, দাঁড়িয়া বাঁন্ধা, হা-ডু-ডু, ডাংগুলি, মোরগ যুদ্ধ অথবা নৌকা বাইচের মত সর্বজন প্রিয় উৎসবগুলি। ডিজিটাল ব্যানারে এ প্রজন্ম আজ আকাশ সংস্কৃতিতেই বিভোর। তবু বাঙালির চিরায়ত উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখে এলেই কৃষ্ণচূড়ার মত রাঙিয়ে যায় মানুষের জীবন। শিমূল-পলাশের মত মানুষের মুখে জেগে ওঠে রক্তিম হাসি। ঢ্যাম্ কুড়্ কুড়্ বাদ্যি বাজিয়ে যান্ত্রিক সভ্যতায় ভেসে বেড়ায় গ্রামীণ সজিবতা। শিশুর সারল্যে অনুভব করি বৈশাখী উন্মাদনা।
নতুন দিনের নতুন সূর্যদয়ে সকল বাঙলি জাতির কাছে অনুরোধ, বাংলা ভূখণ্ডের ইতিহাস ও রাজনীতির কথা মনে রেখে বাংলার অনুষ্ঠান হিসেবে পয়লা বৈশাখকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কেননা ইতিহাসের বাংলা বলতে এখানো অখন্ডিত বাংলাকে বলা হচ্ছে। কারণ অখন্ডিত বাংলার সকল বাংলা ভাষাভাষীর অনুষ্ঠান পয়লা বৈশাখ। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দুটি পৃথক অংশ হলেও ভাষা আর সংস্কৃতি ঐতিহাসিক বাংলার বর্তমান বিভাজিত দুই অংশকে সেতু বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। পয়লা বৈশাখ শুধু দেশের একক কোন উৎসব নয়। কেননা এটি পঁচিশ থেকে ত্রিশ কোটি বছরের বাঙালিরই অনুষ্ঠান, তাইতে তাদের অধিবাস যেখানেই হোক না কেন। আমি আমার বাঙালি জাতির দ্বি-বিভক্তি চাই না। হারাতে চাই না ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মিলন উৎসব। দাঁড়াতে চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি। ইতিহাসকে ফিরে পেতে চাই স্ব-মহিমায়। দেরযুগ আগে সামরিক শাষকের মৌলবাদী মানসিকতার সৃষ্টি দিন পঞ্জিকার ‘(বাংলাদেশ)’ ‘(ভারত)’ ভেঙ্গে ফিরে পেতে চাই বাঙালি জাতির এক আত্মা। বাংলা নববর্ষ হোক বাঙালি জাতির মিলন উৎসব। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত্ব হোক-‘আমরা সবাই বাঙালি’।
লেখক ঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিককর্মী।

No comments:

Post a Comment