Pages

Tuesday, 27 August 2013

যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ


যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ

                                                                  -অপর্ণা সাহা
দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। পাশবিক শক্তি যখন সত্য সুন্দর ও পবিত্রতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেই অসুন্দরকে দমন করে মানবজাতিকে রক্ষা এবং শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠার জন্য যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবত গীতার বর্ণনায় শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে বিশৃঙ্খল ও অবক্ষয়িত মূল্যবোধের পৃথিবীতে মানবপ্রেমের অমিত বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনই সে বাণীর মূল বিষয়। তাই তিনি ভক্তদের কাছে প্রেমাবতার।

ভাদ্র মাসের শ্রীকৃষ্ণাষ্টমীতে তাঁর আবির্ভাব। শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী সংক্ষেপে সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে জন্মাষ্টমী তিথি নামে বহুল সমাদৃত। তিনি এক সবর্গ, স্তবনীয়। তিনি স্বয়ং ভগবান। তাই সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে চিরকালীন বিশ্বাস ‘কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং’। তিনি সর্বকারণের কারণ। তিনি সৎ ও আনন্দস্বরূপ। তাঁর সমান কেউ নেই, তাঁর ঊর্ধ্বেও কেউ নেই। উপনিষদের ভাষায়Ñ ‘তিনি এক সবর্গ ও স্তবনীয় পুরুষোত্তম’। কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিনী নক্ষত্রে ভোজ বংশীয় রাজা উগ্র সেনের পুত্র কংসের কারাগারে দেবকীর কোলে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শাস্ত্রে দেখা যায়, এই আবির্ভাব ছিল বসুদেব-দেবকীর প্রতি ভগবানের তৃতীয়বারের প্রতিজ্ঞা পালন। অষ্টমী তিথিতে দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্ম নিয়েছিল বলে এই তিথির নাম ‘জন্মাষ্টমী’ তিথি। আর এ উপলক্ষে যে আয়োজন বা উৎসব, তার নাম ‘জন্মাষ্টমী’ উৎসব।

গীতাতে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলেছেনÑ “আমি জন্মহীন, অব্যয় আত্মা, ভূতগণের ঈশ্বর (শাসক, নিয়ন্তা স্রষ্টা) হয়েও নিজ প্রকৃতিকে (অনির্বচনীয় মায়াশক্তিকে) আশ্রয় করে আত্মমায়ায় জন্মগ্রহণ করি।” এ ছাড়া তিনি তাঁর জন্ম নিয়ে আরও বলেছেন, তাঁর জন্ম সাধারণ মানুষদের মতো নয় এবং তাঁর মৃত্যুও সাধারণ মানুষের মতো নয়। মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায় কিন্তু আমি জন্মরহিত হয়েও আবির্ভূত হই এবং অবিনশ্বর হয়েও অন্তর্ধান করে থাকি। আবির্ভূত হওয়া এবং অন্তর্হিত হওয়াÑদু’টিই আমার অলৌকিক লীলা। অন্যান্য প্রাণি যেমন কর্মের ফল স্বরূপ জন্মগ্রহণ করে, ভগবানের কিন্তু তেমনটি আবির্ভূত হন না। কর্মের ফলরূপে জন্ম হলে দু’টি ব্যাপার থাকেÑ আয়ু এবং সুখ বা দুঃখভোগ। ভগবানের এই দু’টির কোনোটাই হয় না। কেননা তিনি হলেন আয়ু, সুখ ও দুঃখের ঊর্ধ্বে। অবতরণের সময় ভগবান নিজ শুদ্ধ প্রকৃতিরূপ শক্তিকে আশ্রয় করে অবতরণ করেন এবং অবতাররূপে এই শক্তি দিয়ে কাজ করেন।


শ্রীগীতার বর্ণনামতে ধর্মে গ্লানি এবং অধর্মের বৃদ্ধির তাৎপর্য হল- ভগবদ্ প্রেমী, ধর্মাত্মা, সদাচারী, নিরাপরাধ এবং মানুষদের ওপর নাস্তিক, পাপী, দুরাচার, বলবান ব্যক্তিদের অত্যাচার বৃদ্ধি পাওয়া এবং মানুষের মধ্যে স˜্গুণ সদাচার অত্যন্ত কমে গিয়ে দুর্গুণ-দুরাচারের অত্যাধিক বৃদ্ধি পায়। সনাতন ধর্মীয় ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সত্য এবং ত্রেতা যুগের পরে আসে দ্বাপর যুগ। সত্য যুগে সকলে ছিল সত্যবাদী। সত্য ছিল প্রতিটি স্থানে প্রতিটি স্তরে। মোটকথা ধর্ম ছিল ১০০ ভাগ। সত্য যুগে পরে আসে ত্রেতা যুগ। ত্রেতায় চার অংশের এক অংশ চলে আসে অধর্ম। আর দ্বাপরে বিরাজ করে অর্ধেক ধর্ম এবং অর্ধেক অধর্ম। মানুষের মধ্যে বিরাজ করে স্বার্থে মনোভাব, মানুষই হয়ে ওঠে অত্যাচারী এবং দাঙ্গা হাঙ্গামা মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী।
আর ধর্ম মাথা ঠুঁকে কাঁদতে থাকে। ঠিক এমন সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষ রূপে, মানুষের মাঝে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। শ্রীকৃষ্ণ যখন আবির্ভূত হন তখন পৃথিবীতে বহু ধর্মমত ও উপধর্মমত প্রচলিত ছিল। যে সনাতন যোগধর্ম অনেকবার প্রচারিত হয় এবং লয়ও হয়, শ্রীকৃষ্ণ তাই পুনরায় প্রচলন করলেন। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন, হে অর্জুন, আমার এই দিব্য জন্ম ও কর্ম যিনি তত্ত্বতঃ জানেন, তিনি দেহত্যাগ করে আর জন্মগ্রহণ করেন না, তিনি আমাকেই পেয়ে থাকেন। শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীকে কলুষ মুক্ত করতে কংস, জরাসন্ধ ও শিশুপালসহ বিভিন্ন অত্যাচারিত রাজাদের ধ্বংস করেন এবং ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। কেননা সেই সময় পৃথিবীতে এক অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল। আর তারই অবসান ঘটাতে তিনি ধরাতে অবতরণ করেন।

বেদে বলা আছে ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়, নিরাকার, জ্যোতির্ময়, সর্বত্র বিরাজমান এবং সর্ব শক্তিমান। বেদজ্ঞ জ্ঞানী ঋষিরা নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করে থাকেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে নিরাকার ঈশ্বরের উপলব্ধি খুবই কঠিন কাজ।
মহাকাল ও মহাজগৎ ব্যাপ্ত হয়ে যিনি অনন্ত সর্বশক্তিমান সত্তায় শাশ্বত সত্যরূপে বিরাজিত, আমরা তাকেই ভগবান বা ঈশ্বর নামে ডেকে থাকি। কেবল সনাতনীকল্প মণীষাতেই তিনি অষ্টোত্তর শতনামে সম্ভাসিত হয়েছেন। ভক্তরা তাকে যে নামে ডাকেন, সে নামে তিনি সাড়া দেন। যেভাবে তাকে পেতে চান, সেভাবেই তিনি ধরা দেন। সনাতনী সমাজে তার অবস্থান অনেকটা পরিবারের একজনের মত। তাইতো তিনি দেবকী ও বসুদেবের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে কংসের কারাকক্ষে তাদের সম্মুখে আবির্ভূত হন পুত্ররূপে, কৃষ্ণনামে।  ধর্মরাজ্য সংস্থাপন শ্রীকৃষ্ণের গৌরবময় ভূমিকা এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত। তবে শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছে তার মুখ নিঃসৃত বাণী। যা বই আকারে পাওয়া যায় এবং যার নাম ‘শ্রীমদ্ভগবদগীতা’। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণীই গীতার বাণী, যে বাণী সুখের, যে বাণী ধর্মের এবং যে বাণী শান্তির।

দ্বাপর যুগের অস্তিত্ব এবং বর্তমানঃ দ্বাপর যুগের অস্তিত্ব এবং বিভিন্ন নিদর্শন  বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার রাজা ছিলেন। বর্তমান ভারতের গুজরাট প্রদেশে জামনগর জেলার গোমতি নদীর তীরে দ্বারকা নগরী অবস্থিত এবং এখানে প্রায় ৮০০ বছর আগে নির্মিত ৫৭ মিটার উঁচু কৃষ্ণ মন্দির আছে। এটাই সমস্ত সন্যাসীদের কাছে দ্বারকা বলে স্বীকৃত। অন্যদিকে মহাভারতে বলা হয়েছে যে শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃৃক প্রতিষ্ঠিত দ্বারকা সাগরে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই মহাকাব্যের পরিশিষ্ট অংশ হরিবংশে বলা হয়েছে-এই সমৃদ্ধ নগরী ভারতের পশ্চিম উপকূলে যেখানে গোমতী এসে সাগরে মিলেছে সেখানে অবস্থিত।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত ভারত বিচিত্রার পঞ্চদশ বর্ষ মার্চ ১৯৯৮ ফাল্গুন চৈত্র ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ২৪-২৮ এ গোয়াস্থ ন্যাশানাল ইন্সটিটিউট অব অসেনোগ্রাফি এর মেরিন আরকিওলজি সেন্টারের প্রজেক্ট ডাইরেক্টর ড. এস আর রাও বলেছেন- জলনিমগ্ন সবারকা নগরী খুঁজে পাওয়া গেছে। এই প্রবন্ধে তিনি সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাহাজ আবিষ্কারের সময় খুঁজে পাওয়া জলের নিচে অবস্থিত হিন্দু মন্দিরসহ একটা নগরী আবিষ্কারের এক অত্যাশ্চর্য বর্ণনা দেন। রূপকথার গল্প থেকে তিনি তুলে আনেন দ্বারকা কে মানুষের চোখের সামনে। এই স্থানেই পাওয়া গেছে ২১০ টি জাহাজের ভগ্নাবশেষ যা প্রমাণ করে এখানে এক সময় অবস্থিত ছিল এক বিশাল সমুদ্র বন্দর যা আবার মানুষের চোখের সামনে ঊঠে আসছে। ভারতীয় সমুদ্র উপকূলে অনেক প্রাচীন বন্দর ডুবে গেছে তার মাঝে দ্বারকা অন্যতম। যদিও পুরানো দ্বারকার উপরই নতুন দ্বারকা অবস্থিত তবুও এর প্রকৃত পরিচয় ১৯৭৯-৮০ সালের আগে পাওয়া যায়নি। এ সময় দ্বারকাধীষ মন্দিরের সামনের মাটি খুড়ে খ্রিষ্টপূর্ব ১৪ শতকের তিনটি মন্দিরের ধবংসাবশেষ পাওয়া যায় এবং ডুবন্ত নগরীটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করা হয়। এর মাঝে খ্রীষ্ট পূর্ব নবম শতকে নির্মিত বিষ্ণু মন্দির সবচেয়ে পুরোনো। এখানে বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও দেবাদিদেবের মূর্তি আছে। প্রথমদিকে মাটির স্থরে একটা লাল মাটির বস্তু পাওয়া গেছে। এটি প্রভাসক্ষেত্রের এবং বয়স ১৫শ খ্রিষ্টপূর্বের (কার্বন ১৪ প্রণালীতে বয়স পাওয়া গেছে)। প্রভাস হচ্ছে আরেকটি মহাভারতীয় তীর্থ যেটি সৌরাষ্ট্রের দক্ষিণে অবস্থিত। আরকিওলজিষ্ট হিসে বোরালা বলেছেন, মহাভারতের যুদ্ধ খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ শতকে হবার প্রমাণও পাওয়া গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতকে সমুদ্রের তীরে বসতি ছিল বলে প্রমাণ পাওয়ার পর ডুবন্ত দ্বারকার খোঁজার সম্ভাবনা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা কচ্ছ উপকূলে মাটি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন ১০০০০ বছর আগে এই কচ্ছ উপসাগরীয় অঞ্চল ৬০ মিটার নিচু ছিল। হরিবংশে (বিষ্ণু পর্ব- ৫৭-১০৩) একে সমুদ্রের ভেতরে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান দ্বারকার ৩২ কিমি দুরে খুঁজতে শুরু করেন। এই দ্বারকাতেই পাওয়া গেছে হরপ্পা যুগের পুতির মালা, হাড়ি-পাতিল এবং পলা আকৃতির বিরাট দালানের খন্ডাংশ। এগুলো অনেক প্রাচীন বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। এছাড়া শামুক, ঝিনুক এর তৈরি দেয়াল, সিন্ধু সভ্যতার শঙ্খের সীলমোহরসহ আরো অনেক আরটিফেক্ট এ ভর্তি এই স্থান।
পানির ৬.৪১ মিটার নিচে একটি দুর্গ পাওয়া গেছে, যেটা চুনাপাথরের অর্ধ বৃত্তাকার ব্লক দিয়ে তৈরী। এটি সমুদ্র নারায়ন মন্দির থেকে ৬০০ মিটার সমুদ্র গভীরে অবস্থিত। এখানে তিন ছিদ্র বিশিষ্ট ত্রিফলা নোঙর উদ্ধার করা হয়েছে- যা ক্ষয় রোধক দেয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হত সাথে সাথে শত্রুর আক্রমণ থেকেও বাঁচাত।
ডুবে যাওয়ার কারণঃ বিজ্ঞানীরা অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে- ১০০০০ বছর আগে সমুদ্র পৃষ্ঠ বর্তমান থেকে ৬০ মিটার নিচু ছিল। অতএব ৩৫০০ বছর আগে সমুদ্র ৯ মিটার নিচু ছিল। দ্বারকা ডুবে যাওয়ার কারণ সমুদ্র পৃষ্টের ঊচ্চতা বৃদ্ধি। এভাবে সমুদ্র উপকূল ধ্বংস হতে খুব একটা দেখা যায়না- শুধু মাত্র কার এস সিটি বাহরাইনের এক বন্দর এই সময় এই ডুবে যায়। দুই স্থানের বয়সকাল প্রায় একই বলে নির্ধারন করেছেন বিজ্ঞানীরা। দ্বারকায় যে তৈজসপত্র পাওয়া গেছে তা থেকে বিজ্ঞানীরা ধারনা করেন যে এস্থানে অনেক পুরোনো এক সভ্যতা ছিল যা মহাভারতে বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরীর সাথে মিলে যায়। 
মহাভারতে আছে- শ্রীকৃষ্ণের বয়স যখন ১২৫ তখন যদু বংশ ধ্বংস হয় সামান্য এক কারণে। এটা দেখে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম বনবাসী হবার সংকল্প করেন এবং অর্জুনকে সংবাদ পাঠান। বনে শ্রীকৃষ্ণ বসে থাকা অবস্থায় জরা নামে এক ব্যাধ হরিণ মনে করে কৃষ্ণ কে বান মারেন। শ্রীকৃষ্ণ সেখানেই দেহত্যাগ করেন। অর্জুন এই সংবাদ পেয়ে  দ্বারকায় এসে শ্রীকৃষ্ণের দেহ সৎকার করেন। এর পর পরই দ্বারকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়। যে নগরী শ্রীকৃষ্ণ নিজের হাতে শাসন করেছিলেন সে নগরী শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর পর পরই সমুদ্রের মাঝে বিলীন হয়।

Wednesday, 31 July 2013

হারিয়ে যাচ্ছে নৌকা

 

হারিয়ে যাচ্ছে নৌকা

                                                                 -অপর্ণা সাহা

দেশের বিভিন্ন জেলার হাওর-বাঁওর নদ-নদী,খাল বিল, গুলোর পারাপার বা যাতায়াতের এক মাএ বাহন ছিলো নৌকা । বহমান নদী গুলোর নানা বর্ণের নানান ধরনেন ছোট বড় নৌকা আজ হাড়িয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে। আজকাল আর তেমন একটা চোখে পরে না এই জলবাহন । সহজলভ্যের পাশাপাশি যান্ত্রিক যুগে পানিতেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। পানিতে চলমান নৌকার শতকরা পঁচানব্বই ভাগই হচ্ছে এখন ইঞ্জিনচালিত লঞ্চ বা ষ্টিমার । যাত্রী কিংবা মালামাল পরিবহ সহ মাছ ধরার ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা আজ পাল তোলা বা বৈঠার পরিবর্তে লেগেছে যান্ত্রিকতার ছোয়া । সুনশান নদীতে বিকট আওয়াজ করে প্রচন্ড ও ঢেউ তুলে চলাচল করে এসব নৌকা। ইঞ্জিনচালিত নৌকার বিকট আওয়াজে নদী কিংবা হাওরের দুই পাড়ের গ্রামবাসীদের কান ঝালাপালা হলেও বলার বা প্রতিবাদ করার কিছু নেই চলতে তো হবে। অনেকাংশে নৌকা চলাচলের ফলে সৃষ্ট ঢেউয়ের আঘাতে দু’পারের গ্রামগুলো ভয়াবহ ভাঙনের হুমকির সন্মুখীন।অথচ মাত্র দু’তিন দশক আগেকার কথা।শরৎ কিংবা বর্ষা হেমন্ত কিংবা বসন্ত সব ঋতুতেই জেলা হাওর বাঁওর নদীতে দেখা যেত রঙ বেরং এর পাল তোলা ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা ।বাতাসের সাহায্যে নৌকার গতিকে বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হতো ছোট বড় নানা আকৃতির নানা বর্ণের পাল।নদীতে কিংবা বর্ষায় হাওরের পানিতে ভাসত শত শত ডিঙ্গি আর পাল তোলা নৌকা।মনের আনন্দে মাঝি মাল্লারা পাল তুলে দিয়ে নৌকার হাল ধরে গেয়ে যেত জারি সাড়ি বা ভাটিয়ারী গান আজ আর তা নেই আছে শুধু বিশা বিশা ডেউ ঠেলে দ্রোত ছোটে চলা ইঞ্জিনচালিত লঞ্জ ষ্টিমার । এক সময় এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে কিংবা এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পৌঁছার প্রধান অবলম্বন ছিল নৌকা। শত শত মাঝি তখন এই পেশার উপর নির্ভর করেই তাদের জীবিকা অর্জন করত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নৌকার প্রচলন প্রায় উঠে গেছে বললেই চলে।নদিতে কদাচিৎ পাল বা মাছ ধরার ছোট ডিঙ্গি নৌকার দেখা মেলে,হাওর ও নদীতে পাল তুলে নৌকা চলাচলের দৃশ্য এখন বিরল। পাল তোলা আর ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা এখন কেবলই স্মৃতি।

হাড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঢেঁকি

হাড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঢেঁকি

                                                                  -অপর্ণা সাহা

‘ও ধান বান্ধি রে, ঢেঁকিতে পাড় দিয়া-
আমি নাচি ঢেঁকি নাচে হেলিয়া-দুলিয়া-
ধান বান্ধি রে’...
এ লোক গানের মধ্য দিয়ে ঢেঁকির সঙ্গে শেকড়ের সম্পর্ককে বোঝা যায়। নিরূপণ করা যায় গ্রাম্য জীবনের একটি সময়কে। বোঝা যায় গ্রাম্য মানুষের সঙ্গে ঢেঁকির সম্পর্ককে। বাংলাদেশ ভূমিকেন্দ্রিক সভ্যতার দেশ। শস্য উৎপাদনের ওপর নির্ভর ছিল এ অঞ্চলের অর্থনীতি। শস্যকে বিক্রিপোযোগী করতে যেসব বস্তুর ব্যবহার খুব বেশি করা হতো তার মধ্যে প্রধান ছিল হামানদিস্তা, হাত ঢেঁকি ও ঢেঁকি। এর মধ্যে ঢেঁকি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। দুুু’জন ঢেঁকিতে একই ছন্দে পাড় (ধাক্কা ) দিতো। সামনের গর্তে (লোটা ) ধান দিয়ে একজন ধানকে উল্টে-পাল্টে দিত (ওলাইয়া দেয়া বলা হতো)। ঢেঁকির ছন্দে অনেক গান গাওয়া হতো। মূলত ক্লান্তি নিবারণের জন্য এসব গান গাওয়া হতো। ঢেঁকির বিভিন্ন অংশের নাম ছিল। যে দুখণ্ড কাঠের গুঁড়ির ফাঁকে  ঢেঁকিকে স্থাপন করা হতো তার নাম-কাতলা (স্থান ভেদে ), ঢেঁকির যে অংশটি ধান ভানার কাজ করত বা লোটায় আঘাত করত তাকে বলা হতো-মোনাই। মোনাইর মাথায় লোহার গোলক স্থাপন করা থাকত তাকে বলা হতো-গুলা। ঢেঁকির শব্দে এখন আর মুখরিত হয় না পাড়া। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে ঢেঁকির পরিচিতি। দূরে কোথাও হয়তো ঢেঁকির দেখা মেলে কিন্তু তা এখন অন্ধের হাতি দর্শনের মতো। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো চোখের নিমেষে হারিয়ে গেছে গ্রাম জীবনের এক সময়ের উল্লেখযোগ্য উপজীব্য ঢেঁকি। কয়েক বছর আগেও গ্রামের চিত্রটা ছিল অন্যরকম। বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই ঘন অন্ধকার নেমে আসত গ্রামে। ঝাড়-জঙ্গল থেকে ভেসে আসত ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। তার সঙ্গে সংযোজিত হতো আরো একটি শব্দ। শব্দটি ঢেঁকির। কারণ সন্ধ্যার পরই গ্রামের নারীরা দল বেঁেধ কুপি জ্বালিয়ে ঢেঁকিতে চাল কুটত। এখন এ দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। বিদ্যুৎ এসেছে, বদলে গেছে গ্রামের রূপ। এখন আর অন্ধকারের চুল এলিয়ে দিয়ে সন্ধ্যা নামে না। নেমে আসে না, ডাকে না ঝিঁ ঝিঁ পোকা। ঢেঁকির শব্দও আধুনিকতার হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ঘরের পাশেই গড়ে উঠেছে রাইস মিল। সেখানে মানুষের দীর্ঘ লাইন। সময় কম, দ্রুত কাজ সারা যায়। যন্ত্রসভ্যতা অগ্রগতির ধাক্কায় ছিটকে পড়েছে আমাদের গ্রাম্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির অনবদ্য উপকরণ ঢেঁকি। এক সময় নতুন ধান বাড়িতে তোলার সঙ্গে সঙ্গে বিরাজ করত এক উৎসবমুখর পরিবেশ। গ্রামের এ সময় ঢেঁকি চালানোর প্রতিযোগিতাও শুরু হতো কখনো সখনো। পালাক্রমে দু’জন দু’জন করে ঢেঁকি চালানো হতো। এ সময় গ্রামের নারীদের মুখে চলত পাড়া মাতানো গান। বিরামহীনভাবে ঢেঁকির মাধ্যমে ধান থেকে চাল বানানোর যেন এক উৎসবে মেতে উঠত গ্রামের নারীরা। ঢেঁকিছাঁটা নতুন চালের গন্ধে নারীরা নিজেদের শারীরিক পরিশ্রমের কথা ভুলে যেত। অপেক্ষা থাকত কখন তৈরি হবে বাহারি পিঠা, পায়েস ও ঢেঁকিছাঁটা চিড়াসহ নতুন ধানের বিভিন্ন খাদ্য সম্ভার। ওই সময় গ্রামের অসহায় মহিলাদের ঢেঁকি ছিল একমাত্র আয়ের উৎস। কালের বিবর্তনে বিলীন হয়ে গেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকি। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও এখন ঢেঁকি চালানোর শব্দ শোনা যায় না। প্রত্যন্ত গ্রামেও রাইস মিল গড়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি।

Tuesday, 4 June 2013

হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক পালকি

                                                                  -অপর্ণা সাহা

আধুনিক প্রযুক্তি আর যান্ত্রিক বাহনে যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের প্রাচীন বাংলার  ঐতিহ্যের ধারক “পালকি”। একসময়ে বিয়ের দুলহান-দুলহানীকে বাহনের  অন্যতম মাধ্যম ছিল পালকি। আজ দেখা নেই। প্রত্যান্ত অঞ্চলসহ গ্রাম গঞ্জ থেকে কালেগর্ভে হারিয়ে গেছে বাংলায় সে ঐতিহ্য।
আগামি প্রজম্মকে দেখাতে পালকিকে পঠিয়ে দেওয়া হয়েছে যাদুঘরে। বাংলার সবুজ শ্যামল মেঠো পথের এক সময়ে নিত্য দিনের বাহন ছিল পালকি। পালকির সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের তরুন-তরুনীদের আবেগ গাঁথা এক সম্পর্ক। এর সঙ্গে মিশে ছিল এক মধুময় স্বপ্ন গাঁয়ের পথে পালকিতে করে নববধূকে নিয়ে দৃশ্য দেখতে যুবতী মেয়ে সহ অনেকেই বাড়ির মধ্যে থেকে উঁকি-ঝুঁকি মারত। পালকির মধ্যে বসা বৌকে দেখে তারাও হারিয়ে যেত কল্পনার রাজ্যে রাজকুমারকে নিয়ে। ছয় বেয়ার পালকি কাঁদে নিয়ে অদ্ভুত ছন্দ তুলে বৌকে নিয়ে শ্যামল বাংলার মেঠো পথে চলত। তখন গ্রাম-বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কয়েকগুন বেড়ে যেত। হরিশ মন্ডল, রবি মন্ডল, হরি জিৎ সিং সহ কয়েকজন বলেন,  আমদের বাপ-দাদারা গ্রামে-গঞ্জে পালকির বেয়ারা হিসাবে কাজ করতেন। যৌবনে গায়ে শক্তি থাকতে আমরাও সে  পেশাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহন করেছি। বর্তমানে পালকির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিববার-পরিজন নিয়ে বহু কষ্টে দিনতিপাত করছি। বর্তমানে সে পেশা ছেড়ে বৃদ্ধ বয়সে কাঠ মিস্ত্রী হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করিছি। আগেরকার দিনে নতুন বধু নাইয়র যেত সাজানে গোছানো পালকিতে ছড়ে। এখনকার বধুরা আর পালকিতে লাজ রাঙা মুখে শশুর বাড়ি যায় না। আমাদের সেই শ্যামল গ্রাম, সেই নতুন বধু সবই আছে। শুধু নেই কেবল পালকি।
পালিকির ব্যবহার কখন কিভাবে এদেশে শুরু হয়ে ছিল তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়না। মৌঘল ও পাঠান আমলে বাদশাহ, সুলতান, বেগম ও শাহাজাদীরা পালকিতে যাতায়াত করত। দেশী-বিদেশী পরিবাহক ও ঐতিহাসিকদের তথ্য ও গবেষনা থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। ইংরেজ আমলের নীলকররা পালকিতে করে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলাফেরা করত। আর সেজন্যই পালকি অভিজাত শ্রেনীর বাহন হিসেবে গণ্য করা হত। মোগল আমলে পালকির কারুকাজ রীতিমত একটা কারু শিল্পে পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পলকি দেখতে কাঠের নৌকা কাঠামো। দৈর্ঘ্য ৬ফুট  প্রস্থে তার অর্ধেক কাঠামোটি লম্বা দু’পাশে বাঁশের সাহেয্যে বাঁধা। উপরে ভেলবেটের কাপড়ে মোড়ানো। রেশনের জলর দিয়ে সাজানো।  তৎকালীন মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় এবং বাঙালির সংস্কৃতিতে পালিকির অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। মুসলিম কুলিন সম্প্রদায়ের মেয়েদের পর্দা- পুশিদা রক্ষার জন্য পালকিতে ছড়ে বাড়ির বাহিরে যেত। আগে বিত্তশালী পরিবার গুলোতে নিজস্ব পালকি ও বেয়ারা থাকত। আর নিম্মবিত্তরা তাদের বৌ-মেয়েদের আনা নেওয়ার জন্য পালকি ভাড়া নিত। অন্যসব বাহনে চলা ফেরার ছেড়ে বিয়ে-সাদিতে পালকির ব্যাবহার ছিল অপরিহার্য। নতুন বধুকে নিয়ে বেয়ারার নানান সুখ-দুঃখের গান গেয়ে দুলকি চালে চলত। আর ভেতরের বর এবং বধু তাদের প্রথম সাক্ষাত সেরে নিত স্বলজ্জভাবে। যুগ পাল্টে গেছে রাজা নেই বাদশাহ নেই, নেই পালকিও ও বেয়ারারা। এখনকার নববধূরা পালকিতে ছড়ে শশুর বাড়ি যাওয়া স্বপ্ন দেখে না। তারা এখন জাঁকজমক ভাবে সাজনো কার, মাইক্রো, বাসে করে দৃঢ় প্রত্যেয়ে শুশুর বাড়ি যায়। মানবিক জীবনের এসব যান্ত্রিকতা ব্যাক্তিগত জীবনকে ছুঁয়েচে অনেকাংশে। কালেভদ্রে এখনও কোন গ্রামে বিলসিতা হিসাবে সাজানো মাইক্রোর সঙ্গে হয়তো দেখা মিলে কোন পালকির। তবে সেইদিন আর দূরে নেই, যেদিন আমদের নতুন প্রজম্মরা পালকি নামক মানুষের গাড়ে ছড়া বসা কোন বাহনের কথা বই-পুস্তকে পড়বে এবং লোক শিল্পের যাদুঘরে গিয়ে সাজানো গোছানে কৃত্রিম পালকি দেখবে।
লেখক ঃ সাংস্কৃতিক কর্মী

ইভটিজিং প্রতিরোধে পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে করণীয়

                                                                   -অপর্ণা সাহা

টিজিং কথাটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পরিশ্বাস, জ্বালাতন করা। প্রচলিত এই শব্দটির শাব্দিক প্রতিশব্দ উত্ত্যক্ত করা। ইভটিজিং-এর অর্থ সীমিত নয় বরং উত্ত্যক্ত করার আড়ালে যৌন প্রবৃত্তির মোড়ক উন্মোচিত করা। লম্পট চাহনী, অশ্লীল মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি, শিস ও উস্কানিমূলক তালি বাজানো, গায়ে ধাক্কা দিয়ে অসম্মতিতে অঙ্গ স্পর্শ, পিছু নেওয়া, মুঠোফোনে অশ্লীল ম্যাসেজ ও ছবি পাঠানোসহ ইত্যাদি ।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে, অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশে প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান চাইল্ড পার্লামেন্ট ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১০ প্রকাশিত এক সমীায় জানিয়েছে, বাংলাদেশ স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের মধ্যে ৬২ শতাংশ ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছে। সংগঠনটি দেশের ৬৪টি জেলার ৫১১টি স্কুলে খোঁজ নিয়ে এ তথ্য দিয়েছে। এদের তথ্যের সমর্থন মেলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রিপোর্টে। তার বলছে, দেশে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ইভটিজিংয়ের ঘটনা ঘটে থাকে শিা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে।

ইভটিজিং রোধে করণীয় ঃ
ইভটিজিংয়ের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবার কেউ এককভাবে দায়ী নয়, সমষ্টিগতভাবে আমারা সকলে দায়ী। কেননা ইভটিজার বা অপরাধী হয়ে কেহ জন্মায় না। একটি সুন্দর পরিবারের সুন্দর শিশু বড় হতে হতে এক সময় তার পদস্খলন হয় কেন? তার বীজটা পরিবারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, সমাজেই তার শেকড় প্রোথিত থাকে। পরিবারের সেই বীজটা ধ্বংস করতে হবে, সমাজের সেই শেকড়টা উপরে ফেলতে হবে। এ ব্যাধি নির্মূল করতে আইন সহায়ক শক্তি হিসাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে ; কিন্তু নির্মূল করতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সুস্থ মানসিকতার বিকাশ। একে প্রতিহত করতে সমাজ ও পরিবারের করণীয় বহুবিধ।

পরিবার ঃ     পরিবার মানব জীবনের সবচেয়ে বড় শিা কেন্দ্র। আর পিতা-মাতা প্রতিটি সমাজবদ্ধ জীবের সবচেয়ে বড় ও প্রধান শিক। এখানে তার চরিত্র যেভাবে গঠিত হবে ভবিষ্যৎ জীবনে তাই বড় হয়ে দেখা দেবে। কেননা আচরণ হচ্ছে মানুষের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য এবং তার জন্ম পরবর্তীকালে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পারস্পরিক ক্রিয়া। এ কারণেই মা-বাবা এক হওয়া সত্ত্বেও এক সন্তানের সঙ্গে আরেক জনের আচরণের মিল থাকে না। জন্মসূত্রে মানুষ যে বৈশিষ্ট্য ধারণ করে তাকে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত করতে পারে তার পরিবার ও পরিবেশ। যেমন, একটা শিশু জন্মের পর থেকেই দেখতে থাকল যে তার বাবা-মা প্রচণ্ড ঝগড়াটে। একজন আরেক জনকে মোটেও সহ্য করতে পারে না। কিংবা তার পরিবারের মধ্যে কেউ এমন আছে যে নাকি অনৈতিক কাজের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাহলে ওই শিশুটি কি নিজেকে জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য ঠিক রাখতে পারবে? কখনই পারবে না। পরিবারের সদস্যদের আচরণগত যে ত্র“টি তা শিশুরা তার অভিভাবকদের কাছ থেকে শিখে নিচ্ছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শিশুরা যা দেখে তা সত্য বলে মনে করে এবং বড়দের অনুকরণ করে।

আবার একই পরিবারের দুটি সন্তান পুত্র ও কন্যা, মা-বাবার ভালবাসা কন্যা সন্তানের চেয়ে পুত্রের উপর বেশি। জন্মের পরই নারী-পুরুষের বৈষম্য তার পরিবার থেকেই স্বীকৃত। জন্মসূত্রে পারিবারিকভাবে সৃষ্ট এই বৈষম্য পরিবারকেই দুর করতে হবে। কেননা এই বৈষম্যের কারণে নারী ছোট থেকে জানতে থাকে, সে কামের বস্তু, প্রেমের নয়, একারণে প্রতিবাদী হতে জানেনা। নরও ছেলেবেলা থেকে জানতে থাকে তার জন্মই ভোগ করার জন্য।

প্রতিযোগিতামূলক জীবনে মা-বাবা সন্তানকে যথোপযুক্ত সময় দিতে পারেন না তেমন। ফলে সন্তান মা-বাবার ভালবাসা সঠিক ভাবে পায় না। ভালবাসা না পাওয়ায় এই ঘাটতি, তার প্রভাব পরে সন্তানের চরিত্র গঠনে। ভালবাসা যে পায় না, সে নিজেও কিন্তু ভালবাসতে জানেনা। ফলে যে কিশোরটি ভালবাসা কি জিনিস জানে না, সে অন্যকে ভালবাসতে পারে না। নিজের খেয়াল খুশী মত আচরণ করে। সে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে উত্ত্যক্ত করতেই পারে। যে কিশোরটি নিজের বোনকে শ্রদ্ধা করতে শিখল না, সে অন্যের মেয়েকে কেন শ্রদ্ধা করবে?

এছাড়া মানুষের বয়ঃসন্ধিকালে শরীরে পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক ধরণের উৎসুক মানসিকতাও বিকাশ লাভ করে। তার মনে সব সময় নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়। সে জানতে চায়, তার মধ্যে যে কৌতুহল জন্ম হয় তার জবাব। কিন্তু পরিবারের কঠোরতা, শাসনের বেড়াজাল, কুসংষ্কারমূলক আচরণ স্বাভাবিকভাবেই তার পরিবারের কাছ থেকে জানার প্রত্যাশা হারিয়ে ফেলে।
ভ্রান্ত ধারণা লালন করে তারা প্রতিনিয়ত। সেই ভ্রান্ত ধারণা পুঞ্জীভূত হয়ে ইভটিজিংয়ের মত সমাজ ধ্বংসকারী কার্যকলাপের মানসিকতার সৃষ্টির কারণ হয়। এ কারণে সন্তানের সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক হবে আস্থা ও বিশ্বাসের। তার ব্যতয় ঘটলে সন্তান তার মা-বাবার ও পরিবারের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সন্তানের সঙ্গে প্রতিটি পরিবারের সম্পর্ক হতে হবে বন্ধুর মতো।


সমাজঃ     
(১) বাঙালী সংস্কৃতি চর্চা পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় অতিমাত্রায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সমাজভিত্তিক সংস্কৃতি চর্চায় তারুণ্য খুঁজে পেতে পারে পথের দিশা, আত্মমুক্তি ও পাপাচার থেকে দূরে থাকার আত্মিক শক্তি। আজ দেশে অনেক মিডিয়া, অনেক চ্যানেল, কাগজ, মুঠোফোন, গৃহফোন, কম্পিউটার আরো কত কী! কিন্তু নেতৃত্ব নেই, নেই সমন্বয়ের অব্যর্থ শক্তি। যে কারণে প্রতিযোগিতার ঢেউ-এ জাতীয় কর্মকাণ্ডে রমরমা ভাব, টানটান উত্তেজনা থাকে বটে, থাকে না আত্মনিবেদন, থাকে না এক সঙ্গে এগোবার প্রতিযোগিতা।
 
(২) তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক চর্চা রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা একান্ত জরুরী।

তথ্য প্রযুক্তির কারণে আমাদের এখানে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সুযোগ এসেছে, আর অপসংস্কৃতি জেঁকে বসেছে তারই হাত ধরে। সামাজিকভাবে লুটেপুটে খাওয়ার জন্য যারা উদগ্রীব তাদের এ েেত্র বড় একটা ভূমিকা থাকে। সাধারণত মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করার জন্য তারা নানা কৌশল অবলম্বন করে প্রতিনিয়ত, যার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের সমাজ।
 
(৩) বেকারত্ব দূরীকরণে সমাজকেই ইতিবাচক ও গঠনমূলক দায়িত্ব নিতে হবে।

বেকারত্ব কবলিত তরুণরা নীতিহীন ও আদর্শহীন হয়ে যৌন অনাচারসহ নানা রকম অনাচার, ভ্রষ্টাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতায় মেতে ওঠে। তাদের সে পথ থেকে সুস্থ ও দায়িত্বশীল পথে ফিরিয়ে আনার সকলের কাম্য।
 
(৪) সমাজের সন্দেহ প্রবণ দৃষ্টিভঙ্গীর আমল পরিবর্তন প্রয়োজন।

নারী-পুরুষের প্রকাশ্য হাত ধরাধরিকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী অপরাধ বিবেচনা করে। স্বামী-স্ত্রী হাত ধরে হাঁটবেন, পার্কে বসে গল্প করবেন-এ যেন মহালজ্জার কথা! তাই পার্কে বসে কোন পূর্ণবয়স্ক নর-নারী গল্প করছেন দেখলেই ধরে নেওয়া হয় তারা বিবাহিত নন, হয়তো পরকীয়া প্রেম করছেন। দু’জন ছাত্র-ছাত্রী পরপর দুই দিন গল্প করলে ধরে নেওয়া হয় তাদের সম্পর্ক বিশেষ পর্যায়ের।
 
(৫) খোলামেলা পরিবেশে শিশুদের বয়ঃবৃদ্ধি নিশ্চিতকরতে করতে হবে।

গ্রামের শিশুরা যেভাবে খোলামেলা পরিবেশে বেড়ে ওঠে শহরের শিশুরা সে সুযোগ পায় না। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত এক সঙ্গে চলাফেরা করার সুযোগ পায়। তারা উন্মুক্ত থাকে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গী থাকে মুক্ত। মুক্তমনা হওয়ায় সেখানকার কিশোরদের মধ্যে ইভটিজিং জাতীয় অনাচার খুবই কম। আর শহরের শিশুদের চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। শহরের মানুষের স্বাধীনতা নেই, কৃত্রিম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে তারা। ফলে তাদের অনুভূতিগুলো আত্মকেন্দ্রিক হয়। সে সব কিশোর ইভটিজিংয়ের মত কাজ করতে দ্বিধা করে না।
 
(৬) শিক্ষায়তনে শিশু শিক্ষা থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত আইন বিষয়ক পাঠ্য পুস্তক বাধ্যতামূলক করতে সমাজকে উদ্যোগ নিতে হবে।

জন্মসূত্র থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ আইনী বিষয় অনভিজ্ঞ থাকে। যে কারণে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস তাদের জন্মায় না। সে কারণেই অসামাজিক কার্যকলাপে কিশোরদের মনে কোন প্রকার ভিতির কাজ করেনা।
 
 (৭) কোন ব্যক্তির দিকে অহেতুক তাকিয়ে থাকা বা বারবার তাকানো সামাজিক ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং এটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধে চিহ্নিত কওে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে নারী এখন পুরুষের মতই অর্থনৈতিক শক্তির জোগানদার। দেশের বার্ষিক জাতীয় আয়ের উল্লেখযোগ্য হিস্যা সৃষ্টি হয় নারীদের হাতে। কোন কারণে এতে ঘাটতি পড়া মানেই দেশ অর্থনৈতিক অবনতির পথে যাওয়া।

সামাজিক অসচেতনতা ও পারিবারিক অসুস্থ মানসিকতা ধবংস করতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ। সমাজ-পরিবার তথা সমগ্র জাতিকে আন্তরিকতার বন্ধনে প্রতিহত করতে হবে ইভটিজিং নামক এই ব্যাধি। মনে রাখতে হবে ১৮ বছরের নীচে সকলেই শিশু হিসাবে বিবেচিত। সেই শিশুর বিরুদ্ধে ইভটিজিংয়ের সাজার দাবী বা আইনী লড়াই আজ না হোক আগামীকাল ভাবিয়ে তুলতে পারে।
লেখক ঃ সাংস্কৃতিক কর্মী।

মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও চেতনার প্রভাতফেরি

                                                               -অপর্ণা সাহা

“আজ আমি শোকে বিহ্বল নই,

বাঙালির দুর্গোৎসব ও দেবীতত্ত্ব

                                                                           -অপর্ণা সাহা