Pages

Tuesday, 4 June 2013

হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক পালকি

                                                                  -অপর্ণা সাহা

আধুনিক প্রযুক্তি আর যান্ত্রিক বাহনে যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের প্রাচীন বাংলার  ঐতিহ্যের ধারক “পালকি”। একসময়ে বিয়ের দুলহান-দুলহানীকে বাহনের  অন্যতম মাধ্যম ছিল পালকি। আজ দেখা নেই। প্রত্যান্ত অঞ্চলসহ গ্রাম গঞ্জ থেকে কালেগর্ভে হারিয়ে গেছে বাংলায় সে ঐতিহ্য।
আগামি প্রজম্মকে দেখাতে পালকিকে পঠিয়ে দেওয়া হয়েছে যাদুঘরে। বাংলার সবুজ শ্যামল মেঠো পথের এক সময়ে নিত্য দিনের বাহন ছিল পালকি। পালকির সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের তরুন-তরুনীদের আবেগ গাঁথা এক সম্পর্ক। এর সঙ্গে মিশে ছিল এক মধুময় স্বপ্ন গাঁয়ের পথে পালকিতে করে নববধূকে নিয়ে দৃশ্য দেখতে যুবতী মেয়ে সহ অনেকেই বাড়ির মধ্যে থেকে উঁকি-ঝুঁকি মারত। পালকির মধ্যে বসা বৌকে দেখে তারাও হারিয়ে যেত কল্পনার রাজ্যে রাজকুমারকে নিয়ে। ছয় বেয়ার পালকি কাঁদে নিয়ে অদ্ভুত ছন্দ তুলে বৌকে নিয়ে শ্যামল বাংলার মেঠো পথে চলত। তখন গ্রাম-বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কয়েকগুন বেড়ে যেত। হরিশ মন্ডল, রবি মন্ডল, হরি জিৎ সিং সহ কয়েকজন বলেন,  আমদের বাপ-দাদারা গ্রামে-গঞ্জে পালকির বেয়ারা হিসাবে কাজ করতেন। যৌবনে গায়ে শক্তি থাকতে আমরাও সে  পেশাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহন করেছি। বর্তমানে পালকির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিববার-পরিজন নিয়ে বহু কষ্টে দিনতিপাত করছি। বর্তমানে সে পেশা ছেড়ে বৃদ্ধ বয়সে কাঠ মিস্ত্রী হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করিছি। আগেরকার দিনে নতুন বধু নাইয়র যেত সাজানে গোছানো পালকিতে ছড়ে। এখনকার বধুরা আর পালকিতে লাজ রাঙা মুখে শশুর বাড়ি যায় না। আমাদের সেই শ্যামল গ্রাম, সেই নতুন বধু সবই আছে। শুধু নেই কেবল পালকি।
পালিকির ব্যবহার কখন কিভাবে এদেশে শুরু হয়ে ছিল তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়না। মৌঘল ও পাঠান আমলে বাদশাহ, সুলতান, বেগম ও শাহাজাদীরা পালকিতে যাতায়াত করত। দেশী-বিদেশী পরিবাহক ও ঐতিহাসিকদের তথ্য ও গবেষনা থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। ইংরেজ আমলের নীলকররা পালকিতে করে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলাফেরা করত। আর সেজন্যই পালকি অভিজাত শ্রেনীর বাহন হিসেবে গণ্য করা হত। মোগল আমলে পালকির কারুকাজ রীতিমত একটা কারু শিল্পে পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পলকি দেখতে কাঠের নৌকা কাঠামো। দৈর্ঘ্য ৬ফুট  প্রস্থে তার অর্ধেক কাঠামোটি লম্বা দু’পাশে বাঁশের সাহেয্যে বাঁধা। উপরে ভেলবেটের কাপড়ে মোড়ানো। রেশনের জলর দিয়ে সাজানো।  তৎকালীন মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় এবং বাঙালির সংস্কৃতিতে পালিকির অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। মুসলিম কুলিন সম্প্রদায়ের মেয়েদের পর্দা- পুশিদা রক্ষার জন্য পালকিতে ছড়ে বাড়ির বাহিরে যেত। আগে বিত্তশালী পরিবার গুলোতে নিজস্ব পালকি ও বেয়ারা থাকত। আর নিম্মবিত্তরা তাদের বৌ-মেয়েদের আনা নেওয়ার জন্য পালকি ভাড়া নিত। অন্যসব বাহনে চলা ফেরার ছেড়ে বিয়ে-সাদিতে পালকির ব্যাবহার ছিল অপরিহার্য। নতুন বধুকে নিয়ে বেয়ারার নানান সুখ-দুঃখের গান গেয়ে দুলকি চালে চলত। আর ভেতরের বর এবং বধু তাদের প্রথম সাক্ষাত সেরে নিত স্বলজ্জভাবে। যুগ পাল্টে গেছে রাজা নেই বাদশাহ নেই, নেই পালকিও ও বেয়ারারা। এখনকার নববধূরা পালকিতে ছড়ে শশুর বাড়ি যাওয়া স্বপ্ন দেখে না। তারা এখন জাঁকজমক ভাবে সাজনো কার, মাইক্রো, বাসে করে দৃঢ় প্রত্যেয়ে শুশুর বাড়ি যায়। মানবিক জীবনের এসব যান্ত্রিকতা ব্যাক্তিগত জীবনকে ছুঁয়েচে অনেকাংশে। কালেভদ্রে এখনও কোন গ্রামে বিলসিতা হিসাবে সাজানো মাইক্রোর সঙ্গে হয়তো দেখা মিলে কোন পালকির। তবে সেইদিন আর দূরে নেই, যেদিন আমদের নতুন প্রজম্মরা পালকি নামক মানুষের গাড়ে ছড়া বসা কোন বাহনের কথা বই-পুস্তকে পড়বে এবং লোক শিল্পের যাদুঘরে গিয়ে সাজানো গোছানে কৃত্রিম পালকি দেখবে।
লেখক ঃ সাংস্কৃতিক কর্মী

ইভটিজিং প্রতিরোধে পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে করণীয়

                                                                   -অপর্ণা সাহা

টিজিং কথাটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পরিশ্বাস, জ্বালাতন করা। প্রচলিত এই শব্দটির শাব্দিক প্রতিশব্দ উত্ত্যক্ত করা। ইভটিজিং-এর অর্থ সীমিত নয় বরং উত্ত্যক্ত করার আড়ালে যৌন প্রবৃত্তির মোড়ক উন্মোচিত করা। লম্পট চাহনী, অশ্লীল মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি, শিস ও উস্কানিমূলক তালি বাজানো, গায়ে ধাক্কা দিয়ে অসম্মতিতে অঙ্গ স্পর্শ, পিছু নেওয়া, মুঠোফোনে অশ্লীল ম্যাসেজ ও ছবি পাঠানোসহ ইত্যাদি ।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে, অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশে প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান চাইল্ড পার্লামেন্ট ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১০ প্রকাশিত এক সমীায় জানিয়েছে, বাংলাদেশ স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের মধ্যে ৬২ শতাংশ ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছে। সংগঠনটি দেশের ৬৪টি জেলার ৫১১টি স্কুলে খোঁজ নিয়ে এ তথ্য দিয়েছে। এদের তথ্যের সমর্থন মেলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রিপোর্টে। তার বলছে, দেশে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ইভটিজিংয়ের ঘটনা ঘটে থাকে শিা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে।

ইভটিজিং রোধে করণীয় ঃ
ইভটিজিংয়ের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবার কেউ এককভাবে দায়ী নয়, সমষ্টিগতভাবে আমারা সকলে দায়ী। কেননা ইভটিজার বা অপরাধী হয়ে কেহ জন্মায় না। একটি সুন্দর পরিবারের সুন্দর শিশু বড় হতে হতে এক সময় তার পদস্খলন হয় কেন? তার বীজটা পরিবারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, সমাজেই তার শেকড় প্রোথিত থাকে। পরিবারের সেই বীজটা ধ্বংস করতে হবে, সমাজের সেই শেকড়টা উপরে ফেলতে হবে। এ ব্যাধি নির্মূল করতে আইন সহায়ক শক্তি হিসাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে ; কিন্তু নির্মূল করতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সুস্থ মানসিকতার বিকাশ। একে প্রতিহত করতে সমাজ ও পরিবারের করণীয় বহুবিধ।

পরিবার ঃ     পরিবার মানব জীবনের সবচেয়ে বড় শিা কেন্দ্র। আর পিতা-মাতা প্রতিটি সমাজবদ্ধ জীবের সবচেয়ে বড় ও প্রধান শিক। এখানে তার চরিত্র যেভাবে গঠিত হবে ভবিষ্যৎ জীবনে তাই বড় হয়ে দেখা দেবে। কেননা আচরণ হচ্ছে মানুষের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য এবং তার জন্ম পরবর্তীকালে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পারস্পরিক ক্রিয়া। এ কারণেই মা-বাবা এক হওয়া সত্ত্বেও এক সন্তানের সঙ্গে আরেক জনের আচরণের মিল থাকে না। জন্মসূত্রে মানুষ যে বৈশিষ্ট্য ধারণ করে তাকে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত করতে পারে তার পরিবার ও পরিবেশ। যেমন, একটা শিশু জন্মের পর থেকেই দেখতে থাকল যে তার বাবা-মা প্রচণ্ড ঝগড়াটে। একজন আরেক জনকে মোটেও সহ্য করতে পারে না। কিংবা তার পরিবারের মধ্যে কেউ এমন আছে যে নাকি অনৈতিক কাজের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাহলে ওই শিশুটি কি নিজেকে জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য ঠিক রাখতে পারবে? কখনই পারবে না। পরিবারের সদস্যদের আচরণগত যে ত্র“টি তা শিশুরা তার অভিভাবকদের কাছ থেকে শিখে নিচ্ছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শিশুরা যা দেখে তা সত্য বলে মনে করে এবং বড়দের অনুকরণ করে।

আবার একই পরিবারের দুটি সন্তান পুত্র ও কন্যা, মা-বাবার ভালবাসা কন্যা সন্তানের চেয়ে পুত্রের উপর বেশি। জন্মের পরই নারী-পুরুষের বৈষম্য তার পরিবার থেকেই স্বীকৃত। জন্মসূত্রে পারিবারিকভাবে সৃষ্ট এই বৈষম্য পরিবারকেই দুর করতে হবে। কেননা এই বৈষম্যের কারণে নারী ছোট থেকে জানতে থাকে, সে কামের বস্তু, প্রেমের নয়, একারণে প্রতিবাদী হতে জানেনা। নরও ছেলেবেলা থেকে জানতে থাকে তার জন্মই ভোগ করার জন্য।

প্রতিযোগিতামূলক জীবনে মা-বাবা সন্তানকে যথোপযুক্ত সময় দিতে পারেন না তেমন। ফলে সন্তান মা-বাবার ভালবাসা সঠিক ভাবে পায় না। ভালবাসা না পাওয়ায় এই ঘাটতি, তার প্রভাব পরে সন্তানের চরিত্র গঠনে। ভালবাসা যে পায় না, সে নিজেও কিন্তু ভালবাসতে জানেনা। ফলে যে কিশোরটি ভালবাসা কি জিনিস জানে না, সে অন্যকে ভালবাসতে পারে না। নিজের খেয়াল খুশী মত আচরণ করে। সে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে উত্ত্যক্ত করতেই পারে। যে কিশোরটি নিজের বোনকে শ্রদ্ধা করতে শিখল না, সে অন্যের মেয়েকে কেন শ্রদ্ধা করবে?

এছাড়া মানুষের বয়ঃসন্ধিকালে শরীরে পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক ধরণের উৎসুক মানসিকতাও বিকাশ লাভ করে। তার মনে সব সময় নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়। সে জানতে চায়, তার মধ্যে যে কৌতুহল জন্ম হয় তার জবাব। কিন্তু পরিবারের কঠোরতা, শাসনের বেড়াজাল, কুসংষ্কারমূলক আচরণ স্বাভাবিকভাবেই তার পরিবারের কাছ থেকে জানার প্রত্যাশা হারিয়ে ফেলে।
ভ্রান্ত ধারণা লালন করে তারা প্রতিনিয়ত। সেই ভ্রান্ত ধারণা পুঞ্জীভূত হয়ে ইভটিজিংয়ের মত সমাজ ধ্বংসকারী কার্যকলাপের মানসিকতার সৃষ্টির কারণ হয়। এ কারণে সন্তানের সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক হবে আস্থা ও বিশ্বাসের। তার ব্যতয় ঘটলে সন্তান তার মা-বাবার ও পরিবারের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সন্তানের সঙ্গে প্রতিটি পরিবারের সম্পর্ক হতে হবে বন্ধুর মতো।


সমাজঃ     
(১) বাঙালী সংস্কৃতি চর্চা পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় অতিমাত্রায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সমাজভিত্তিক সংস্কৃতি চর্চায় তারুণ্য খুঁজে পেতে পারে পথের দিশা, আত্মমুক্তি ও পাপাচার থেকে দূরে থাকার আত্মিক শক্তি। আজ দেশে অনেক মিডিয়া, অনেক চ্যানেল, কাগজ, মুঠোফোন, গৃহফোন, কম্পিউটার আরো কত কী! কিন্তু নেতৃত্ব নেই, নেই সমন্বয়ের অব্যর্থ শক্তি। যে কারণে প্রতিযোগিতার ঢেউ-এ জাতীয় কর্মকাণ্ডে রমরমা ভাব, টানটান উত্তেজনা থাকে বটে, থাকে না আত্মনিবেদন, থাকে না এক সঙ্গে এগোবার প্রতিযোগিতা।
 
(২) তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক চর্চা রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা একান্ত জরুরী।

তথ্য প্রযুক্তির কারণে আমাদের এখানে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সুযোগ এসেছে, আর অপসংস্কৃতি জেঁকে বসেছে তারই হাত ধরে। সামাজিকভাবে লুটেপুটে খাওয়ার জন্য যারা উদগ্রীব তাদের এ েেত্র বড় একটা ভূমিকা থাকে। সাধারণত মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করার জন্য তারা নানা কৌশল অবলম্বন করে প্রতিনিয়ত, যার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের সমাজ।
 
(৩) বেকারত্ব দূরীকরণে সমাজকেই ইতিবাচক ও গঠনমূলক দায়িত্ব নিতে হবে।

বেকারত্ব কবলিত তরুণরা নীতিহীন ও আদর্শহীন হয়ে যৌন অনাচারসহ নানা রকম অনাচার, ভ্রষ্টাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতায় মেতে ওঠে। তাদের সে পথ থেকে সুস্থ ও দায়িত্বশীল পথে ফিরিয়ে আনার সকলের কাম্য।
 
(৪) সমাজের সন্দেহ প্রবণ দৃষ্টিভঙ্গীর আমল পরিবর্তন প্রয়োজন।

নারী-পুরুষের প্রকাশ্য হাত ধরাধরিকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী অপরাধ বিবেচনা করে। স্বামী-স্ত্রী হাত ধরে হাঁটবেন, পার্কে বসে গল্প করবেন-এ যেন মহালজ্জার কথা! তাই পার্কে বসে কোন পূর্ণবয়স্ক নর-নারী গল্প করছেন দেখলেই ধরে নেওয়া হয় তারা বিবাহিত নন, হয়তো পরকীয়া প্রেম করছেন। দু’জন ছাত্র-ছাত্রী পরপর দুই দিন গল্প করলে ধরে নেওয়া হয় তাদের সম্পর্ক বিশেষ পর্যায়ের।
 
(৫) খোলামেলা পরিবেশে শিশুদের বয়ঃবৃদ্ধি নিশ্চিতকরতে করতে হবে।

গ্রামের শিশুরা যেভাবে খোলামেলা পরিবেশে বেড়ে ওঠে শহরের শিশুরা সে সুযোগ পায় না। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত এক সঙ্গে চলাফেরা করার সুযোগ পায়। তারা উন্মুক্ত থাকে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গী থাকে মুক্ত। মুক্তমনা হওয়ায় সেখানকার কিশোরদের মধ্যে ইভটিজিং জাতীয় অনাচার খুবই কম। আর শহরের শিশুদের চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। শহরের মানুষের স্বাধীনতা নেই, কৃত্রিম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে তারা। ফলে তাদের অনুভূতিগুলো আত্মকেন্দ্রিক হয়। সে সব কিশোর ইভটিজিংয়ের মত কাজ করতে দ্বিধা করে না।
 
(৬) শিক্ষায়তনে শিশু শিক্ষা থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত আইন বিষয়ক পাঠ্য পুস্তক বাধ্যতামূলক করতে সমাজকে উদ্যোগ নিতে হবে।

জন্মসূত্র থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ আইনী বিষয় অনভিজ্ঞ থাকে। যে কারণে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস তাদের জন্মায় না। সে কারণেই অসামাজিক কার্যকলাপে কিশোরদের মনে কোন প্রকার ভিতির কাজ করেনা।
 
 (৭) কোন ব্যক্তির দিকে অহেতুক তাকিয়ে থাকা বা বারবার তাকানো সামাজিক ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং এটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধে চিহ্নিত কওে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে নারী এখন পুরুষের মতই অর্থনৈতিক শক্তির জোগানদার। দেশের বার্ষিক জাতীয় আয়ের উল্লেখযোগ্য হিস্যা সৃষ্টি হয় নারীদের হাতে। কোন কারণে এতে ঘাটতি পড়া মানেই দেশ অর্থনৈতিক অবনতির পথে যাওয়া।

সামাজিক অসচেতনতা ও পারিবারিক অসুস্থ মানসিকতা ধবংস করতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ। সমাজ-পরিবার তথা সমগ্র জাতিকে আন্তরিকতার বন্ধনে প্রতিহত করতে হবে ইভটিজিং নামক এই ব্যাধি। মনে রাখতে হবে ১৮ বছরের নীচে সকলেই শিশু হিসাবে বিবেচিত। সেই শিশুর বিরুদ্ধে ইভটিজিংয়ের সাজার দাবী বা আইনী লড়াই আজ না হোক আগামীকাল ভাবিয়ে তুলতে পারে।
লেখক ঃ সাংস্কৃতিক কর্মী।

মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও চেতনার প্রভাতফেরি

                                                               -অপর্ণা সাহা

“আজ আমি শোকে বিহ্বল নই,

বাঙালির দুর্গোৎসব ও দেবীতত্ত্ব

                                                                           -অপর্ণা সাহা


Monday, 3 June 2013

উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান

নদীমাতৃকদেশ বাংলাদেশ। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটি দ্বারা সৃষ্ট আমাদের এই জন্মভূমি। হাজার বছর ধরে সংগ্রাম করে জাতিসত্তা বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙালিরা। এই জাতি কখনোই সংস্কৃত, ফার্সী ও ইংরেজি ভাষার নিকট পরাজয়বরণ করেনি। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির আদর্শে উদ্ভাসিত সংগ্রামী বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হাজার বছর ধরে বাঙালিরা পরাধীন ছিল। পরাধীনতার গ্লানি মুছে দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাঙালির সম্মুখে মহানায়কের ভূমিকায় আর্বিভূত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণে তিনি সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল নিউজ উইক পত্রিকা বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ আখ্যায়িত করে। ব্যক্তি জীবনে শেখ মুজিব ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্নেহধন্য। সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন-‘মুজিব একদিন ইতিহাস সৃষ্টি করবে’। শেখ মুজিব ছিলেন বিদ্রোহী বাংলার মূর্ত প্রতীক।
শেখ মুজিবুর রহমান আইয়ুব খানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাঙালির মুক্তি সনদ-ছয় দফা ঘোষণা করেন। এজন্য তাঁকে দীর্ঘদিন কারাবাস করতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলে। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে তিনি মুক্তি লাভ করেন। আটক অবস্থায় তাঁকে প্যারোলে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের আহ্বান জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। একজন মুক্ত মানুষ হিসাবে তিনি লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। ছয় দফার প্রশ্নে তিনি অনড় ছিলেন। তাঁর ছয় দফা দাবি না মানার কারণে আলোচনা ভেঙ্গে যায়। ১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বঙ্গবন্ধুর বিজয় হয়। সামরিক শক্তির পরাজয় ঘটে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। যার যা আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে আলোচনা ভেঙ্গে যায়। ২৫ মার্চ পাক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর আক্রমণ চালায়। প্রতিবাদে ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন। পাকিস্তানী স্বৈরশাসক তাঁকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে আটক রাখে। বিচারে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। তবুও তিনি পাকিস্তানীদের সাথে কোন আপোষ করেননি। তাঁর অবর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। ভারত-রাশিয়া বাংলাদেশ সরকারকে সবরকমের সহযোগিতা দেয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকায় মিত্রবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসাবে বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি মুক্ত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে প্রণীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। এ সংবিধানের মূলনীতি ছিল-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।
ঘাতকদের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু রক্ত দিয়ে মাতৃভূমির ঋণ পরিশোধ করেন। ঘাতকদের নির্মমতা কারবালার হত্যাকাণ্ড ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার হত্যার ঘটনাকেও ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘ ২১ বছর পর্যন্ত হত্যার বিচার হয়নি। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে পিতা-মাতা-ভাই ও আত্মীয়-স্বজনদের হত্যার বিচার সমাপ্ত করেন। পাঁচ খুনীর ফাঁসি হয়েছে। এখনো ছয় খুনী পালিয়ে আছে।
আজ জাতির জনক হত্যার দিন পনেরই আগস্ট। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমাদের অতীত ইতিহাসের অনেক কিছুই অজানা। তারা জানতে চায়। বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক-কেবলই কী নির্বাচিত শব্দ মাত্র? তা তো' নয়। তবে কেন সরকার পরিবর্তন হলেই অবমূল্যায়িত হতে থাকেন বঙ্গবন্ধু? যদি হাজার বছরের বাংলার উজ্জ্বলতম দুই জ্যোতিষ্ক পুরুষের কথা বলতে হয়, তাহলে শতাব্দীর প্রথমার্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অপরার্ধে শেখ মুজিবুর রহমান।
রবীন্দ্রনাথ প্রায় দ্বাদশবর্ষকাল বসবাস করেন বাংলাদেশের হৃদয়-ভূমিতে। পদ্মা
-আত্রাই, ষড়ঋতুর বিচিত্র বিভঙ্গ, ছোটো ছোটো গ্রাম আর ছোটো ছোটো সুখ দুঃখের গ্রামীণ মানুষ উঠে এসেছে তাঁর গানে কবিতায় গল্পে। দেশটিকে তিনি নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করেছিলেন, নাম-‘সোনার বাংলা’।
আরেক মহৎ পুরুষ, তিনি অবশ্য সাহিত্যের মানদণ্ডে কবি নন, তিনি রাজনীতির কবি। তিনি নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, নির্মাতা এবং স্বপ্নদ্রষ্টা। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলি কাটিয়েছেন রাজনৈতিক নির্যাতনে, কারান্তরালে। শতাব্দীর বিশেষ এক ক্রান্তিকালে বিশ্বের সবচাইতে আলোচিত ঐ ব্যক্তিত্ব আমাদেরই ঘরের শেখ মুজিব। দু'য়ের মাঝে মিল খুঁজে পাই। মুজিবের আন্দোলন-সংগ্রামের উদ্দিষ্ট যে স্বপ্নের দেশ, কেমন করে সে দেশ এসে মিশে গেছে রবীন্দ্রভাবনার সাথে। সেই ঠিকানা 'সোনার বাংলা'। কবিতা-গান আর স্বপ্ন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত শেষ সত্য-১৯৭১-এ বিশ্বমানচিত্রে এক নবীন রাষ্ট্র, নাম তার বাংলাদেশ।
স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনীর বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে, যখন শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগারে। তাঁর প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সেই কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁর দেশবাসীর উত্তাল আনন্দধ্বনির মধ্যে ঢাকায় এসে নামেন। সেই ১০ই জানুয়ারিতে তিনি সোনার বাংলাকে মুক্ত হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তাঁর নিজের আন্দোলনকে ষাট বছর আগে শুরু হওয়া আরেক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে উদ্ধৃতি দেন রবীন্দ্রনাথের ১৯১১ সালে লেখা একটি কবিতা থেকে। সেটা ছিল মুজিবের জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন, এমন একটা দিন যেদিন স্বাধীনতার জন্যে নিবেদিত একটি জীবন তার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছিল, যেদিন ১৯০৫-১২ কাল পর্যায়ের ঘটনাবলী বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছিল বাংলার হাতে। শেখ যখন রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা থেকে উদ্ধৃতি দেন, জনতা তখন গেয়ে ওঠে-
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥
লেখক ঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী।

আমরা সবাই বাঙালি


নববর্ষ আসলে আমরা ভাগ করে নিতে চাই বাংলা সংস্কৃতির আনন্দ। নগর জীবনে কৃষকের ফসল তোলার আনন্দ। এই সংস্কৃতি কৃষকের নয় এই সংস্কৃতি শহুরে জীবনে হাফিয়ে ওঠা মানুষের চিত্তবিনোদন। নগর সংস্কৃতির যে মূলভিত্তি থেকে তৈরি হয়েছে বা আমরা বলতে পারি নগর সংস্কৃতির মানুষজন যে অবস্থান থেকে উঠে এসেছে তার ঋণ স্বীকার করে নেয়ার এক অনবদ্ধ আয়োজন বৈকি অন্য কিছু নয়। পুরনো স্মৃতিকে স্মরণ রাখার জন্য তৈরী করছি এ সংস্কৃতি বা আমরা যে একসময় কৃষকের সন্তান ছিলাম সে কথাই মনে করতে চাই বলেই বার বার সেই পান্তা, সেই আটপৌড়ে জীবন, সেই নবান্নের সিন্নি, পায়েস, পিঠা-পুলি, সেই জংলিপাড়ের মোটা কাপড় পরে বলতে চাই ‘আমরা বাঙালি ছিলাম রে’।
অথচ আমাদের এই বাঙালি সেজে ওঠা বর্তমান প্রজন্ম কতটুকু জানে অতীত, আর কতটুকুই বা জানে বর্তমান! অতীত ইতিহাসটা এরকম ‘সম্রাট আকবরের সময় কৃষকদের থেকে কর আদায় করা হতো হিজরী সন অনুযায়ী। কিন্তু লুনার ক্যালেন্ডার (চন্দ্র বছর) অনুস্মরণ করা হিজরী সনের প্রথম দিন একেক বছর একেক সময়ে আসতো। ফলে অনেক সময় কৃষকদের ফসলহীন মৌসুমে কর দিতে হতো যা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যেতো। সম্রাট আকবর এই সমস্যার সমাধান করার জন্য সে সময়ের বিশিষ্ট পন্ডিত ফতেউল্লাহ সিরাজীকে একটা নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির আদেশ দেন। পরবর্তিতে ফতেউল্লাহ সিরাজী হিজরী ক্যালেন্ডার এবং জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের মধ্যে একটা ‘স্যুধ ট্রানজেশন’ ঘটন অর্থাৎ লুনার ধারণা অনুস্মরণ করা হিজরী সনকে জর্জিয়ান ধারণায় রূপান্তর করেন। যদিও এই ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করা হয় ১৫৮৪ খৃষ্টাব্দের ১০ (অথবা মতান্তরে ১১) মার্চ, তবে হিসেব গণনা করা শুরু করা হয় (ব্যাক ডেট) ১৫৫৬ সন থেকে, যা আকবরের সিংহাসন আরোহনের সন। ঐ বছরের (১৫৫৬) হিজরী সনকে ফতেউল্লাহ সিরাজীর তৈরি করা জর্জিয়ান হিসাব অনুযায়ী বাংলা বর্ষ গণনা শুরু হয়। সে হিসেবে পেছন দিকে গুণতে থাকলে বাংলা ৯৬৩ সনের আগে আর কোনো সন পাওয়া সম্ভব নয়। আরেকটা বিষয় ল্য করে থাকবেন হয়তো পাঠক, বাংলা সন এবং হিজরী সন খুব কাছাকাছি বিরাজ করছে। বর্তমানে ১৪৩০ হিজরী সন চলছে এবং বাংলা শুরু হলো ১৪১৬। আজ থেকে ৪৫৩ বছর আগে ৩৫৫ দিনের (প্রায়) হিজরী সনকে ৩৬৫ দিনের (প্রায়) বাংলা সনে রূপান্তর করা হয়।
একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বাংলাদেশ পহেলা বৈশাখ সব সময় ১৪ এপ্রিল পড়ে; কিন্তু ভারতে সেটা কখনও ১৪ আবার কখনও ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। অথচ, ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের সকল বাঙালী একই দিনে নেচে উঠত বৈশাখের রংয়ের ছটায়। কিন্তু ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামল বাঙালিকে করে দেয় দ্বিধাবিভক্ত। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারী থেকে চালু হয় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রণীত বাংলা বর্ষপঞ্জি। বর্তমান চলমান বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিন হয়। শেষের ৭ মাস ৩০ দিন হয়। (৫ গুণ ৩১= ১৫৫ দিন, ৭ গুণ ৩০= ২১০ দিন)। ১৫৫ দিন + ২১০ দিন= ৩৬৫ দিন বা এক বছর। লিপইয়ার বা মূল বছরে চৈত্র মাস হবে ৩১ দিনে। অর্থাৎ লিপইয়ার বাংলা বছর হয় ৩৬৬ দিনে। লিপইয়ার বলতে সেই বছর বুঝায়, যে বছরকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে নিঃশেষে বিভাজ্য হয়। হারিয়ে যায় সমগ্র বাঙালির এক সাথে নেচে ওঠা। বাঙালি জীবনে দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায় নববর্ষের আবেগ। বিনা প্রশ্নেই মেনে নেয় সব শ্রেণীর মানুষ! স্বৈরশাসক তার স্বৈরাচারী মনোভাব শুধু বাঙালি জীবনের এই অধ্যায়ে চাপিয়ে দিয়েই ্যান্ত হননি, নিজের নিরাপত্তা বিচারে একুশের প্রথম প্রহর নাম দিয়ে রাত ১২টা ১মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের রেওয়াজ চালু করে। অথচ বাঙালি সংস্কৃতি রাত ১২টা ১মিনিটে দিনের প্রথম প্রহর বিবেচনা করে না। আবহমান বাংলার দিনের শুরু প্রত্যুষ আর দিনের অবসান সন্ধ্যা। নাগরিক জীবনে দ্বি-খন্ডিত করে ফেলা হয় একুশের আবেগ। যা আজও চলমান!
আরেকটি বিষয় এখানে একটু ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনবোধ করছি। প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের সময় রাত ১২.১ মিনিটে মানুষ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়। এই রীতিটা সম্পূর্ণ ভুল। জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিন শুর হয় রাত ১২টার পর থেকে কিন্তু বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিন শুর হয় সূর্যদ্বয়ের পর। ঠিক যেমনটা হিজরী ক্যালেন্ডারে দিন শুর হয় সূর্যাস্তের পর থেকে। ফলে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো উচিৎ সকালে সূর্যোদয়ের সময়। শুভেচ্ছা যখন বাংলা নববর্ষের জানাচ্ছি তখন এই সামান্য অজ্ঞতাটুকু থেকে বের হয়ে আসতে দোষ কোথায়?
গ্রাম্য সংস্কৃতির বা কৃষকদের এটাই একমাত্র অনুষ্ঠান যেটা ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পালন করা হয়। এই অনুষ্ঠানের মর্মমূল হচ্ছে কৃষকদের নতুন ফসল ঘরে তোলা ও জমিদারদের কাছে ঋণমুক্ত হওয়ার আনন্দ। অথচ শহরের কয়জনই বা এই বিষয়ে অবগত থাকেন! জমিদারী প্রথা বিলোপের সাথে সাথে নগরে অর্থাৎ কৃষকদের মাঝে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করার আমেজ বেশ থিতিয়ে এসেছে। তবে বাংলা দিনপঞ্জিকার প্রথম দিন হিসাবে দেশের শিতি সমাজে এর কদর বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে।
বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে আমাদের ভেতরে আশার সঞ্চার করে বটে; কিন্তু একটু তলিয়ে এবং খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে আজকাল সবখানেই আমাদের সংস্কৃতি চর্চার নামে যা হচ্ছে সেটা হল তার বিকৃতিকরণভাষা থেকে শুরু করে পোশাক, সঙ্গীত, নৃত্যকলা, খাদ্যাভ্যাস সবখানেই। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি এখন ব্যবসায়ের পণ্যতে পরিণত হয়েছে। আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ বিশেষ কায়দায় প্রদর্শন করে সর্বচ্চ মুনাফা আদায় করছে বহুমুখী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো; টেলিভিশন ও প্রিন্টেড মিডিয়া রঙিন রঙিন ছবি পেশ করে কাটতি বাড়াচ্ছে বহুগুণে, ১০টি এস এম এস ফ্রি দেওয়া হচ্ছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য এমনই সত্ত্বা আবেগ আমাদের! আমি এসবের কোনকিছুকেই দোষের মনে করছি না। কিন্তু যখন ‘অতিরিক্ত’ ছাপিয়ে ওঠে ‘প্রকৃত’ আয়োজনকে তখন মাথা ব্যথা করে বৈকি।
সারাদেশে রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ এসো হে..’ গানের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার বাঙ্গালী পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেই। এখানে প্রকাশ পায় বাংলার স্বাধীন মানুষের প্রাণের উচ্ছ্বাস-এর বহিঃপ্রকাশ। সমসত্ম জাতি একই কাতারে সামিল হয়ে আনন্দ উদ্যাপন করে। আমাদের মত দরিদ্র-দুর্নীতিগ্রস্থ দেশে তো সেটা কল্পনা করাই আকাশ কুসুম চিন্তার সামিল। হাজার সমস্যায় জর্জরিত আমাদের জীবন প্রবাহ, সমাজ ও রাষ্টীয় ব্যবস্থা। এমন অবস্থায় পহেলা বৈশাখ প্রতি বছর সমগ্র বাঙ্গালীর দেহে এক চিলতে প্রাণের সঞ্চার করে। সারাদেশে তা বেশ স্পষ্ট। তবে বর্তমানে যা হয় তার সবটা কি আমাদের সংস্কৃতি ? ২০০১ সালে বোমা হামলা, প্রতি বছরই যত্রতত্র নারীদের ইভটিজিং এর শিকার হওয়া। আর ১০০-২০০ টাকা দরে এক প্লেট পান্তা-ইলিশ খাওয়া। চাইনিজ বা থাই না খেলে যে বাঙ্গালীদের আজকাল জাত রা হয় না, সে বাঙ্গালীদের বছরে এই একটি দিনে আয়েশ করে পান্তা ইলিশ ভণ করে বাঙ্গালিত্ব যাহির করার যে প্রয়াস তা আমাদের পূর্ব পুরুষদের দরিদ্রতাকে প্রচন্ডভাবে অপমান করে এবং হেয় করে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যত দিন যাচ্ছে পহেলা বৈশাখ উদযাপন তত বেশি আড়ম্বরময় হচ্ছে। তার মানে কি এই যে সময়ের পরিক্রমায় আমাদের বাঙ্গালিত্ব্ আরো প্রগাঢ় ও গূঢ় হচ্ছে? বোধহয় না। মিথ্যাকে যাহির করার জন্যই তো ঢাক-ঢোলের প্রয়োজন বেশি! আমরা যে আমাদের হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় অর্জিত সংস্কৃতি থেকে ক্রমান্বয়ে ছিটকে যাচ্ছি সেটা ঢেকে রাখার জন্যই এত বাদ্য পেটানো। আমার মনে হয় নিজের বিবেককে ঠেকানো ও ঠকানোর সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম এটা।
আমাদের সংস্কৃতির আচার ও অনুষ্ঠানগুলো যেদিন থেকে ফ্যাশন-এর কারণ হয়ে উঠেছে সেদিন থেকে শুরু হয়েছে আমাদের সংস্কৃতির সর্বনাশা রূপ। একটা জাতি যখন তাদের সংস্কৃতি ও লোকাচারকে বাইরে বের করে আনে তখন তাদের শূন্য অন্দরমহলে অন্যকোনও সংস্কৃতি গোপনে দানা বাঁধতে থাকে। আমাদের বুকের ভেতরটা নেড়ে-ঘেঁটে দেখা খুব জরুরী হয়ে উঠেছে। আমি আমাদের সংস্কৃতি চর্চার সবখানেই হতাশাব্যক্ত করছি না। আশার ব্যাপার হল, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই দেশ ও দেশের সংস্কৃতি নিয়ে ভাবছে। সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের হাত থেকে আমাদের সংস্কৃতিকে রা করতে তারা সদা তৎপর। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পহেলা বৈশাখের উৎসবমুখর উদযাপর তারই প্রমাণ বহন করে। পরিশেষে রবীন্দ্রনাথের মত বলতেই হচ্ছে, আমাদেরকে নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকে আপন করতে শিখতে হবে, অন্যথায় প্রকৃত মুক্তি মিলবে না।
আসুন, আমরা আমাদের অজ্ঞতাগুলো ঝেড়ে ফেলে নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে জানার চেষ্টা করি। নতুন দিনের নতুন সূর্যোদয়ে সকল বাঙালি জাতির কাছে অনুরোধ, বাংলা ভূখণ্ডের ইতিহাস ও রাজনীতির কথা মনে রেখে বাংলার অনুষ্ঠান হিসেবে পয়লা বৈশাখকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কেননা ইতিহাসের বাংলা বলতে এখানো অখণ্ডিত বাংলাকে বলা হচ্ছে। কারণ অখন্ডিত বাংলার সকল বাংলা ভাষাভাষীর অনুষ্ঠান পয়লা বৈশাখ। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দুটি পৃথক অংশ হলেও ভাষা আর সংস্কৃতি ঐতিহাসিক বাংলার বর্তমান বিভাজিত দুই অংশকে সেতু বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। পয়লা বৈশাখ শুধু দেশের একক কোন উৎসব নয়। কেননা এটি পঁচিশ থেকে ত্রিশ কোটি বছরের বাঙালিরই অনুষ্ঠান, তাইতে তাদের অধিবাস যেখানেই হোক না কেন। আমার বাঙালী জাতির দ্বি-বিভক্তি চাই না। হারাতে চাই না ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মিলন উৎসব। দাঁড়াতে চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি। ইতিহাসকে ফিরে পেতে চাই স্ব-মহিমায়। দেরযুগ আগে সামরিক শাষকের মৌলবাদী মানসিকতার সৃষ্টি দিন পঞ্জিকার ‘(বাংলাদেশ)’ ‘(ভারত)’ ভেঙ্গে ফিরে পেতে চাই বাঙালী জাতির এক আত্মা। ‘আমরা বাঙালি ছিলাম রে...’ এই গানটির মর্মকথা ধারণ করে এগিয়ে নিতে চাই না বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে। বাংলা নববর্ষ হোক বাঙালি জাতির মিলন উৎসব। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত্ব হোক-‘আমরা সবাই বাঙালী’।
লেখক ঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিককর্মী।

অনুভবে বৈশাখ



একটি ভূখণ্ড হঠাৎ জেগে ওঠতে পারে কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি হঠাৎ জেগে ওঠার মতো নয়। ‘বাঙালি’ নামক একটি জাতির ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অনেক পুরোনো, যা আজ বিভিন্ন স্থানে খনন করে প্রাপ্ত উপাদানসমূহ বলে দিচ্ছে। এদেশের মুগ্ধ প্রকৃতির পানে তাকিয়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা বলেন, কি সুন্দর এদেশের প্রকৃতিÑ মাঠ-ঘাট, অরণ্য, নদী-নালা, পাহাড়-পবর্ত। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে প্রকৃতি নিজের হাতে গড়ে তুলেছে বিশাল সবুজের সমারোহ।
কবি মাইকেল মধুসূদনের ঐতিহাসিক সাগরদাঁড়ি গ্রাম আর কপোতা নদ, কুষ্টিয়ার লালন ফকিরের বসতভিটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি বাংলাদেশের প্রান্তবর্তী জনপদ চট্টগ্রাম, যার কথা যুগে যুগে কবি-সাহিত্যকগণ এর বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন উপমায়, শৈল-কিরীটিনী, নদী-মালিনী ইত্যাদি বলে, প্রাচীন ‘বাকলা চন্দ্র দ্বীপ’ নামের বর্তমানের বরিশাল, পাঁচটি ,গড়ের সমষ্টি পঞ্চগড়, পুরোহিত ঠাকুর পরিবারের নামানুযায়ী ঠাকুরগাঁও, নীলচাষের কেন্দ্রভূমি নীলফামারী, রঙ্গ বা রেশম সুতার উৎপাদনের শহর রংপুর, বিপ্লবী কৃষক নেতা নুরুলদিনের ঘনিষ্ট সাথী ‘লালমনি’র নামের নামের লালমনিরহাট, প্রাচীন বাংলার মৌর্য ও গুপ্ত শাসনামলে ‘পুন্ড্রনগর’ বগুড়া, নাট্যপুর নামের নাটোর, রাজ ও শাহীর সম্মিলিত রাজশাহী, স্বাধীন বাংলাদেশের সূতিকাগার এবং অস্থায়ী রাজধানী ও ঐতিহাসিক মুজিবনগর মেহেরপুর, বাংলা মাঘ শব্দ থেকে মাগুরা, চাঁদ সওদাগর অথবা জমিদার চাঁদরায়ের নামের চাঁদপুর, কামালাঙ্ক তথা কুমিল্লাসহ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়-ই বিচরণ করলে দেখা যাবে বাংলার প্রাচীন জনপদ ও মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতিপ্রিয়তা ও ঐতিহ্যকে লালনের নমুনা।
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তবে আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। (তথ্য: উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে) দেশভাগ হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার বাংলা সংস্কৃতির ওপর কালো থাবা বিস্তারের ল্েয পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাকিস্তান সরকারের এই অন্যায় আচরণের জবাব দিতেই ‘ছায়ানট’ ১৯৬৫ সনের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ, ১৯৭২ বঙ্গাব্দ) রমনার বটমূলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে। বস্তুত এই দিনটি থেকেই ‘পহেলা বৈশাখ’ বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতির অন্যতম এক পরিচায়ক রূপ লাভ করে। ১৯৭২ সালে (১৯৭৯ বঙ্গাব্দ) ‘পহেলা বৈশাখ’ বাংলাদেশের জাতীয় পার্বন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের অণুসারী হিংস্্রহানাদাররা থামিয়ে দিতে চেয়েছিলো বৈশাখের আয়োজন। সেজন্যে বাংলা নববর্ষ উদযাপনকল্পে সমবেত মানুষের ওপর হয়েছিলো বোমা হামলা। কিন্তু বাঙালি শত বাধার মুখেও প্রতিবছর পালন করে যাচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘বাংলা নববর্ষ’ বা ‘পহেলা বৈশাখ’। বাঙালি আজ প্রমাণ করেছে তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতি। বাংলা সন, বাংলা গান, বাঙালি খাদ্য, অভিরুচি, আপ্যায়ন সবই তার নিজস্ব ঢংয়ে। এ জাতির রীতি-নীতি, কৃষ্টি-সংস্কৃতি একদমই অন্য জাতি থেকে পৃথক। বছরের শেষ দিনে যেমন দেখা যায় হালখাতা উৎসব, ঠিক তেমনি নতুন বছরের শুরুতে যখন দেখা যায় প্রাণখোলা আনন্দের বন্যা। তরুণীরা নতুন বছরের শুরুতে সাদা জমিনের লাল পাড় দেয়া শাড়ি পরে, তরুণ-যুবকরা ফতুয়া, পাঞ্জাবি পরে, শিশু-কিশোররা মেতে ওঠে মেলায় নানা রকমের খেলনার সামগ্রী নিয়ে। ঐতিহ্যপ্রিয় পান্তাভাত, ইলিশ মাছ ও বেগুণভাজি খাওয়ার ধুম পড়ে।
বাঙালি জীবনে বাধা-বিপত্তি থাকা সত্বেও, হিম্ কুহেলিকায় ঝরে যাওয়া গাছের পাতা, কোকিলের একটানা উদাসীসুর, মানুষের মনে যখন একরাশ কান্তি এসে ছুঁয়ে যায়, তখন বসন্তরাজ ধীরে ধীরে গাছে গাছে নব-কিশলয়ে, ফসলের মাঠে শস্য দানায় পূর্ণ করে মানুষের মুখে হাঁসি ফুটিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। নেমে আসে উৎসবের ঢল। মেলা বসে গ্রামে-গ্রামে। কত না বিচিত্র্য হাতের তৈরি দ্রব্য সম্ভার সে সব মেলায় বিক্রি হয়। সে সকল জিনিস দেখলে বাঙলার মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবন ধারার একটা স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। গ্রাম বাংলার এ মেলা যেন মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। মাটির পুতুল, খেলনা, পাটের তৈরি শিকা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখা, ঝিনুকের মালা, বাঁশের বাঁশি, পুঁতির মালা, রকমারি মিষ্টান্ন আরো কতনা অদ্ভূত-অদ্ভূত সব জিনিসের সমাবেশ ঘটে সে মেলায়। তাদের জীবন যেন খণ্ড-খণ্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতে কারুকাজে। মানুষ গরীব হতে পারে, দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে তারা জর্জরিত হতে পারে, কিন্তু এসব দুঃখ কষ্ট তাদের জীবনকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। ক্রমান্বয়ে নববর্ষের ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃত হয়। রূপান্তরিত হয় লোকজ উৎসবে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। আধুনিক জীবন-পদ্ধতির নানা উপাচারের সমারোহে খেরো খাতায় হিসাব রাখার প্রচলন এখন উঠেই গেছে। শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা আজ ভুলে যেতে বসেছি, সংস্কৃতির ধারক-বাহক ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই সব লোকজ খেলা, দাঁড়িয়া বাঁন্ধা, হা-ডু-ডু, ডাংগুলি, মোরগ যুদ্ধ অথবা নৌকা বাইচের মত সর্বজন প্রিয় উৎসব গুলি। ডিজিটাল ব্যানারে এ প্রজন্ম আজ আকাশ সংস্কৃতিতেই বিভোর। তবু বাঙালির চিরায়ত উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখে এলেই কৃষ্ণচুড়ার মত রাঙিয়ে যায় মানুষের জীবন। শিমূল-পলাশের মত মানুষের মুখে জেগে ওঠে রক্তিম হাসি। ঢ্যাম্ কুড়্ কুড়্ বাদ্যি বাজিয়ে যান্ত্রিক সভ্যতায় ভেসে বেড়ায় গ্রামীণ সজিবতা। শিশুর সারল্যে অনুভব করি বৈশাখী উন্মাদনা।
লেখক ঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিককর্মী

কতটুকু ভাল আছে আমার দেশের শ্রমিক


এসেছে ১ মে। এসেছে পর্যালোচনা করার সময়। বিশ্বায়নের এই সময়ে কতটুকু ভাল আছে আমাদের দেশের শ্রমিক সমাজ। পর্যালোচনা করার পূর্বে আমাদের বোঝা দরকার, শ্রমিক বলতে আমরা কি বুঝি? যদিও আমাদের সমাজে শুধুমাত্...র কল-কারখানা, রিক্সা চালক , বিভিন্ন গোডাউনে যার কাজ করেন, তাদেরকেই শ্রমিক হিসাবে চিহ্ণিত করেন সামাজের বিজ্ঞ কলামিষ্ট ও প্রচার মাধ্যম গুলো। আসলে কি তাই! যার সাংবাদিক. লেখক, সঙ্গীত, মডেলিং, অভিনয়-এর মতো শিল্পের সাথে যুক্ত হয়ে অন্ন যোগাচ্ছে তারা কি শ্রমিক নয়! যে সকল প্রতিষ্ঠান এ সকল শিল্পী শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে আয় করছেন ল-ল টাকা, তারা কি মানুষের শ্রম বিক্রি করছেন না! তাহলে পেশাদার শিল্পীদের শ্রমিক বলতে বাধা কোথায়? আমার মনে হয়, সমাজের মুনাফালোভী স্বার্থনেষী কতিপয় মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার মানসে শিল্পীদের শ্রমিক বলতে কুণ্ঠিত। শিল্পী সমাজ নিয়ে এক জরীপে দেখা যায়, এই সম্প্রদায় একটু ভাবুব প্রকৃতির মানুষ হিসাবে সমাজে পরিলতি। উদার মনোভাবাপন্ন মানষিকতায় তাদের পথ চলা। তারা তাদের শিল্পকর্মের মাধ্যেমেই প্রতিবাদের ভাষা ব্যক্ত করেন। যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয় না। এই সম্প্রদায় হরতালের মত বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিনিময়ে প্রতিবাদ জানাতে চান না। সমাজের তিসাধিত কোন কর্মকাণ্ডই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আর এ কারণেই তাদের সরল্যতাকে পুঁজি করে ন্যায্য অধিকরা থেকে বঞ্চিত করছে স্বার্থানেষী প্রতিষ্ঠান গুলো। বলাবাহুল্য, বর্তমানে একাধিক এনজিও, বিভিন্ন নামধারী এ্যাডভ্রাটাইজিং প্রতিষ্ঠান গুলো দেশের তৃণমূল থেকে সঙ্গীত, নৃত্য, যন্ত্রি, অভিনয় শিল্পীসহ বিভিন্ন প্রতিভায় প্রতিভাবানদের এনে চাকুরী নামে তাদের শৈলপিক শ্রমকে বিক্রি করে লুফে নিচ্ছে ল ল টাকা। আর ঐ প্রতিভাবান শ্রমিকদের দেয়া হচ্ছে সামান্য পারিশ্রমিক, কিন্তু তাদের খাটিয়ে নেয় হচ্ছে দৈনিক-‘গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা’। এমন কি সরকারি ছুটিও তারা ভোগ করতে পারেন না। আর এ জন্য প্রতিষ্ঠান গুলোর বরাদ্দ নেই অতিরিক্ত পারিশ্রমিক। যে মে দিবসকে কেন্দ্র করে এত আলোচনা, সেই মে দিবসেও এহেন শ্রমিকরা তাদের শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছেন প্রতিষ্ঠান গুলোর কর্মপন্থার নিয়মাবলীতে। অথচ দিবস এলেই সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত নামধারী প্রতিষ্ঠান গুলো শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। আলোচনার টেবিল ভেঙে ফেলেন প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে। অথচ তাদের গৃহেই নেই শ্রম অধিকারের ন্যায্য হিসাব। আলোচনার ময়দানে তারা শিকার করতে রাজী নন, শৈলপিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও শ্রমিক। কিন্ত তার শিকার করুন বা না-ই করুন এটাই সত্য, শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করাটাই হচ্ছে শ্রমিক হবার মূল কথা।
এবার আসা যাক মে দিবস পালন প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে মে দিবস শুধু কর্পোরেটদের বিজ্ঞাপনেই পালিত হয়, এখনো আমরা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ অমানবিক শ্রমের কাজে যাওয়া রুখতে পারিনি। তৃতীয় বিশ্বের একটি অতিদরিদ্র দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে দেশটি বৃহৎ হলেও মানবসম্পদ উন্নয়নের দিক থেকে আমাদের দেশের অবস্থান দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বনিম্ন। এদেশের কর্মম জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেকার, বৃদ্ধি পাচ্ছে শিতি বেকারের সংখ্যা। মুখে বহু কথা বলা হলেও কার্যত এখানে শ্রমশক্তি পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগানোর জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এক পোষাক শিল্প বাদে এখানে অন্য কোন শিল্প তেমনভাবে বিকশিত হয়নি, বিদেশী আগ্রাসনে তা বিকশিত হতে দেওয়া হয়নি -এটাই সত্য। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পরে ‘সোনালী আঁশ‘ খ্যাত পাট শিল্পের কথা। আমাদের সম্ভাবনাময় পাট শিল্পকে ধ্বংস করা হয়েছে সুকৌশলে, কোন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ছাড়াই একের পর এক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে পাটকলগুলো। আর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পাটকলগুলো লোকসানে রেখে সরকার তা চালাতে পারবে না। অথচ, রাষ্ট্রের বিজ্ঞ ব্যক্তিরা কি দেখছেন না, ল-ল শ্রমিকের বেকারত্ব? তারা যদি বছরের পর বছর ধরে লোকসানে চলা কলগুলো লাভের দিকে অগ্রসরের জন্য যুগোপযোগী ইতিবাচক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, তাতে বাঁচতো একটা বৃহৎ শিল্প, সমৃদ্ধ হতো স্বদেশ, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেত মানুষ।
যখন অন্য কোন শিল্প এদেশে বিকশিত হয়নি, বা হতে দেওয়া হয়নি। এমনি এক সময়ে বিকাশ ঘটে পোষাক শিল্পের, পোষাক শিল্প বিকাশের পেছনে প্রধান যেদিকটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, তা হলো ন্যূনতম অথবা নামমাত্র মূল্যে অধিক শ্রম, যা সম্ভবতঃ বর্তমান পৃথিবীতে সর্বনিম্ন। গ্রামের মানুষ তার সহজাত জীবন-ধারায় চলতে না পেরে দু‘মুঠো অন্নের আশায় পারি জমায় শহরে; আর এরাই মূলতঃ পোষাক শিল্পের শ্রমের জোগানদাতা।
একটু ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের মাত্র ৫০টির মতো কারখানা ছিল, যা বর্তমানে লাধিক। আর এথেকে শ্রমিকের সংখ্যাটাও ধারণা করা যায়। এই শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী শ্রমিক। তাই শ্রমিক অধিকারের কথা বললে পোষাক শ্রমিকদের দুর্দশার চিত্রটিই আমাদের সামনে ফুটে উঠে। বিভিন্ন সময় গার্মেন্টস শিল্পে অগ্নিকাণ্ড, বিল্ডিং ধ্বস- এর মতো মর্মান্তিক দূর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে, আহতের সংখ্যাও কম নয়। কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে- শ্রমিকদের কি সে হিসাবে তিপূরণ দেয়া হয়েছে? সম্প্রতি সাভরে রানাপ্লাজা ধ্বসে নিহতদের পরিবারের হাতে একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য হিসাবে দেয়া হয়েছে মাত্র (২০,০০০) বিশ হাজার টাকা! মানবিক কারণেই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের অতি নিম্নআয়ের একটি অংশই এ কাজে জড়িত। সেই নিম্নআয়টিও শ্রমিক ঠিকমতো পায় না; উপরন্তু, তাকে দিয়ে ৮ ঘন্টার স্থলে যখন ১২-১৬ ঘন্টা পর্যন্ত খাটানো হয় কোন ওভার টাইমের বালাই ছাড়াই, অসুস্থ শ্রমিককে ন্যূনতম চিকিৎসাটুকুও দেয়া হয় না, তখন রাজপথে নামা ছাড়া শ্রমিকদের কিইবা করার থাকে! অথচ এই অধিকারটুকু অর্জনের জন্যই ১৮৮৬ সালে শিকাগোয় নিজেদের অধিকার আদায়ের ল্েয অন্দোলন করে ছিল শ্রমজীবি মানুষ।
১০ থেকে ১২ ঘণ্টার শ্রম কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনার আকাংখা ছিল শ্রমিকের দাবী। ৮ ঘণ্টা হোক কাজের সময়। এই ছিলো তাদের চাওয়া। তৎকালীন তারা সময় বেঁধে দিয়েছিলো ১ মে এর মধ্যে তাদের দাবি মেনে নিতে হবে। কিন্তু কারখানার মালিকরা তা মেনে নেয়নি। ৪ মে ১৮৮৬ সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। তারা ১৮৮৬ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন। “অগাস্ট স্পীজ” নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। পুলিশবাহিনী তৎনাত শ্রমিকদের উপর অতর্কিত হামলা শুরু করে যা রায়টের রূপ নেয়। ১১ জন শ্রমিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পুলিশ হত্যা মামলায় অগাস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে জনসমে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ছয় বছর পর ২৬শে জুন ১৮৯৩, ইলিনয়ের গর্ভনর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন এবং বিচারে রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। অগাস্ট স্পীজসহ নিহত শ্রমিকদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের সেই আত্মত্যাগের ফলেই যুক্তরাস্ট্রের শিল্প মালিকেরা শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবী মেনে নিয়েছিলেন। তখন থেকে পুঁজিবাদী বিশ্বে এই দিনটি নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য না হলেও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ঘটা করে পালন করা হয় মহান মে দিবস।
সকল শ্রমজীবি মানুষের অধিকার এবং নিরাপত্তার দাবী আদায়ে যথোপযুক্ত পদপে নেয়া এখন সময়ের দাবী। শুধু একদিন এই ১লা মে’ই নয়, বছরের সেই সব নিয়মিত দিনে যেসব সময় আমরা তাদের সাথে সম্পর্কিত থাকি অথবা থাকিনা সকল সময়েই আমাদের মানবিক বোধের সর্বোচ্চ অনুভূতিগুলো জেগে উঠুক এবং সমাজ রাষ্ট্র পৃথিবী হোক সংকটহীন আবাসযোগ্য একটি বাসস্থান।
অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী

বাঙালির পহেলা বৈশাখ


পহেলা বৈশাখ, বাঙলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম দিন। নয়া উদ্যোগের অঙ্গীকার নিয়ে আজকের সূর্যোদয়ের মধ্যে দিয়ে নতুন সনের আগমন। নতুন সূর্যের সামনে বাঙালি আজ প্রণতি রাখবে “জীর্ণপুরাতন যাক ভেসে যাক, মুছে যাক গ্লানী’/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’। অরুণ আলোয় আবহমান এ বাংলার দিক-দিগন্ত উদ্ভাসিত করে আসে নতুন দিন। নবপ্রভাতে বাঙালির জীবনে চারদিকে নতুনের কেতন উড়িয়ে আসে বৈশাখ।
‘আজি এ ঊষার পুণ্য লগনে’ বাঙালির কায়মনো প্রার্থনা: যা কিছু কেদ, গ্লানি পাপ, মূঢ়তা, যা কিছু জীর্ণ-শীর্ণ-দীর্ণ, যা কিছু পুরাতন তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে হোক ছাই। বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক। বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত হোক বাংলার চারদিক। কবিগুরুর সেই চিরায়ত সুর বাঙালির প্রাণে আলোরণ তুলুক: “তোরা সব জয়ধ্বনি কর /তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখীর ঝড়”. . .।
যদিও এটি কোন ধর্মীয় উৎসব নয়। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালীর উৎসব। মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজো আর খ্রীস্টানদের বড়দিন যেমন সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়, তার চেয়েও অনেক বেশি বর্ণাঢ্যভাবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে বাঙালী বরণ করে নেয় বাংলা নববর্ষকে। কারণ এটা বাঙালির এক অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এর প্রধান আকর্ষণ হলো নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরা। তা যেমন-পোশাক ও খাবার দাবারে, তেমনি সাজগোজেও। তাই পয়লা বৈশাখে বাহারি সাজে বাঙালির ঢল নামে পথে, ঘাটে, মাঠে আর মেলায়। এই সাজগোজের প্রস্তুতি কমবেশি থাকে সব ঘরেই। এ েেত্র প্রধান ভূমিকা পালন করে নারীরা। সাজসজ্জায় যে নারীদের উৎসাহ চিরন্তন, তাও সকলের জানা। তাই যে কোন উৎসব এলেই নারীরা নিজেদের সাজাতে ও রাঙাতে হয়ে ওঠেন তৎপর। আর তা যদি হয় নিজস্ব সংস্কৃতির তা হলে তো কোন কথাই নেই। তখন সাজসজ্জায় উঠে আসে নানা বৈচিত্র্য, আর পাল্টে যায় এর আমেজও। বাঙালী জীবন যাত্রায় শুরু হয় পালা গান হয়, পুঁথি পাঠ, যাত্রা গানের আসর। বছরের অন্য মাসে যেমন সারাদিন ভরা েেত কাজ করে সময় কাটাতে হয়, বৈশাখে এসে জীবনের ধারা বদলে যায়। সারাদিন কাজ নয়, উৎসব মুখর জীবন এ জীবনের মাঝেই বাঙালীরা খুঁজে পায় এক নতুন আস্বাদ, নতুন করে জীবন চলার পথের উপাদান, প্রেরণা আর উদ্দীপনা। তাই বাঙালী জীবন এ মাসের গুরুত্ব নিঃসন্দেহে অপরিসীম। জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষ নতুন উদ্যোমে পরবর্তী মাসগুলোর কর্মমুখর জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
কৃষির সঙ্গে বাংলা নববর্ষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সূচনা থেকেই। চিরকাল ঋতুর উপর ভিত্তি করেই হয় ফসলের চাষাবাদ। মোগল সম্রাট আকবর প্রচলন করেন বাংলা সনের। এর আগে মোগল বাদশাহগণ রাজকাজে ও নথিপত্রে ব্যবহার করতেন হিজরী সন। হিজরী চান্দ্র বছর, যা ন্যূনধিক ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয় কিন্তু সৌর বছর পূর্ণ হয় ন্যূনধিক ৩৬৫ দিনে। বছরে প্রায় ১১ দিনের পার্থক্য হওয়ায় হিজরী সন আবর্তিত হয় এবং ৩৩ বছরের মাথায় সৌর বছরের তুলনায় এক বছর বৃদ্ধি পায়। কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে হলে সারাদেশে একটি অভিন্ন সৌর বছরের প্রয়োজন। এই ধারণা থেকেই সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহনের সময় অর্থাৎ ১৫৫৬ খৃস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। আকবরের নবরতœ সভার আমির ফতেউল্লাহ খান সিরাজী বাংলা সন প্রবর্তনের কাজটি সম্পন্ন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলী সন। পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বৈশাখ নামটি নেয়া হয়েছিল নত্র বিশাখার নাম থেকে। হিন্দু পূরাণের তথ্যানুযায়ী দেবী বিশাখার নামের প্রভাবে এই বৈশাখ মাস। ‘বিশাখা হইতে নাম হইল বৈশাখ/আরম্ভিলা গ্রীষ্মকাল প্রখর নিদাঘ/এই মাস হইতে বঙ্গে বর্ষ শুরু হয়/সিদ্ধিদাতা জগানন গণেশ কৃপায়”। বাঙালি হিন্দুদের পূজা পার্বনসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান চাঁদের হিসেব অনুযায়ী হয়। অথচ চন্দ্র পদ্ধতির হিসেব প্রতি সৌর বছরের হিসেব থেকে ১০/১১ দিনের পার্থক্য ঘটে। তাই প্রতি তিন সৌর বছর যখন সাড়ে ৩২ দিনের বেশী হয় তখন বছরের হিসেব থেকে একমাস অতিরিক্ত ধরে মূল হিসেব থেকে বাদ দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। এই অতিরিক্ত মাসকে বলা হয় অতিরিক্ত মাস বা মল মাস। আর সৌর সনের সঙ্গে চন্দ্র মাসের এই মিল করাকে বলা হয় ‘শাবন মিতি’। মল মাসে হিন্দুদের কোন পূজা, পার্বন অথবা বিবাহসহ যে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিধান না থাকলেও মুসলিম সমাজের জন্য এটা কোন সমস্যার ছিল না।
১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের সকল বাঙালি একই দিনে নেচে উঠত বৈশাখের রংয়ের ছটায়। কিন্তু ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে স্বৈর শাসক এরশাদের শাসনামল বাঙলিকে করে দেয় দ্বি-বিভক্ত। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারী থেকে চালু হয় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রণীত বাংলা বর্ষপঞ্জি। বর্তমান চলমান বর্ষপঞ্জী অনুসারে বছরের প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিন হয়। শেষের ৭ মাস ৩০ দিন হয়। (৫ গুণ ৩১ = ১৫৫ দিন, ৭ গুণ ৩০= ২১০ দিন)। ১৫৫ দিন + ২১০ দিন = ৩৬৫ দিন বা এক বছর। লিপইয়ার বা মল বছরে চৈত্র মাস হবে ৩১ দিনে। অর্থাৎ লিপইয়ার বাংলা বছর হয় ৩৬৬ দিনে। লিপইয়ার বলতে সেই বছর বুঝায়, যে বছরকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে নিঃশেষে বিভাজ্য হয়। হারিয়ে যায় সমগ্র বাঙালির এক সাথে নেচে ওঠা। বাঙালি জীবনে দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায় নববর্ষের আবেগ। বিনা প্রশ্নেই মেনে নেয় সব শ্রেণীর মানুষ! স্বৈর শাসক তার স্বৈরাচারী মনোভাব শুধু বাঙালি জীবনের এই অধ্যায়ে চাপিয়ে দিয়েই ্যান্ত হননি, নিজের নিরাপত্তা বিচারে একুশের প্রথম প্রহর নাম দিয়ে রাত ১২টা ১মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের রেওয়াজ চালু করে। অথচ বাঙালি সংস্কৃতি রাত ১২টা ১মিনিটে দিনের প্রথম প্রহর বিবেচনা করে না। আবহমান বাংলার দিনের শুরু প্রত্যুষ আর দিনের অবসান সন্ধ্যা। নাগরিক জীবনে দ্বি-খন্ডিত করে ফেলা হয় একুশের আবেগ। যা আজও চলমান!
বাঙালি জীবনে বাধা-বিপত্তি থাকা সত্বেও, হিম্ কুহেলিকায় ঝরে যাওয়া গাছের পাতা, কোকিলের একটানা উদাসীসুর, মানুষের মনে যখন একরাশ কান্তি এসে ছুঁয়ে যায়, তখন বসন্তরাজ ধীরে ধীরে গাছে গাছে নব-কিশলয়ে, ফসলের মাঠে শস্যদানায় পূর্ণ করে মানুষের মুখে হাঁসি ফুটিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। নেমে আসে উৎসবের ঢল। মেলা বসে গ্রামে-গ্রামে। কত না বিচিত্র্য হাতের তৈরি দ্রব্য সম্ভার সে সব মেলায় বিক্রি হয়। সে সকল জিনিস দেখলে বাঙলার মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবন ধারার একটা স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। গ্রাম বাংলার এ মেলা যেন মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। মাটির পুতুল, খেলনা, পাটের তৈরি শিকা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখা, ঝিনুকের মালা, বাঁশের বাঁশি, পুঁতির মালা, রকমারি মিষ্টান্ন আরো কতনা অদ্ভূত-অদ্ভূত সব জিনিসের সমাবেশ ঘটে সে মেলায়। তাদের জীবন যেন খণ্ড-খণ্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতে কারুকাজে। মানুষ গরীব হতে পারে, দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে তারা জর্জরিত হতে পারে, কিন্তু এসব দুঃখ কষ্ট তাদের জীবনকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। ক্রমান্বয়ে নববর্ষের ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃত হয়। রূপান্তরিত হয় লোকজ উৎসবে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। আধুনিক জীবন-পদ্ধতির নানা উপাচারের সমারোহে খেরো খাতায় হিসাব রাখার প্রচলন এখন উঠেই গেছে। শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা আজ ভুলে যেতে বসেছি, সংস্কৃতির ধারক-বাহক ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই সব লোকজ খেলা, দাঁড়িয়া বাঁন্ধা, হা-ডু-ডু, ডাংগুলি, মোরগ যুদ্ধ অথবা নৌকা বাইচের মত সর্বজন প্রিয় উৎসবগুলি। ডিজিটাল ব্যানারে এ প্রজন্ম আজ আকাশ সংস্কৃতিতেই বিভোর। তবু বাঙালির চিরায়ত উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখে এলেই কৃষ্ণচূড়ার মত রাঙিয়ে যায় মানুষের জীবন। শিমূল-পলাশের মত মানুষের মুখে জেগে ওঠে রক্তিম হাসি। ঢ্যাম্ কুড়্ কুড়্ বাদ্যি বাজিয়ে যান্ত্রিক সভ্যতায় ভেসে বেড়ায় গ্রামীণ সজিবতা। শিশুর সারল্যে অনুভব করি বৈশাখী উন্মাদনা।
নতুন দিনের নতুন সূর্যদয়ে সকল বাঙলি জাতির কাছে অনুরোধ, বাংলা ভূখণ্ডের ইতিহাস ও রাজনীতির কথা মনে রেখে বাংলার অনুষ্ঠান হিসেবে পয়লা বৈশাখকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কেননা ইতিহাসের বাংলা বলতে এখানো অখন্ডিত বাংলাকে বলা হচ্ছে। কারণ অখন্ডিত বাংলার সকল বাংলা ভাষাভাষীর অনুষ্ঠান পয়লা বৈশাখ। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দুটি পৃথক অংশ হলেও ভাষা আর সংস্কৃতি ঐতিহাসিক বাংলার বর্তমান বিভাজিত দুই অংশকে সেতু বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। পয়লা বৈশাখ শুধু দেশের একক কোন উৎসব নয়। কেননা এটি পঁচিশ থেকে ত্রিশ কোটি বছরের বাঙালিরই অনুষ্ঠান, তাইতে তাদের অধিবাস যেখানেই হোক না কেন। আমি আমার বাঙালি জাতির দ্বি-বিভক্তি চাই না। হারাতে চাই না ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মিলন উৎসব। দাঁড়াতে চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি। ইতিহাসকে ফিরে পেতে চাই স্ব-মহিমায়। দেরযুগ আগে সামরিক শাষকের মৌলবাদী মানসিকতার সৃষ্টি দিন পঞ্জিকার ‘(বাংলাদেশ)’ ‘(ভারত)’ ভেঙ্গে ফিরে পেতে চাই বাঙালি জাতির এক আত্মা। বাংলা নববর্ষ হোক বাঙালি জাতির মিলন উৎসব। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত্ব হোক-‘আমরা সবাই বাঙালি’।
লেখক ঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিককর্মী।

বিশ্বকবি এবং কবিদের কবি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর
পূন্য হল অঙ্গমম, ধন্য হল অন্তর,
সুন্দর হে সুন্দর’
কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি, কবি চায় প্রীতি, কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ, সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে। যেমন স্বীকার করেছিলেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলির মধ্যে দিয়ে যখন এশিয়া মহাদেশের সর্বপ্রথম নোবেল পুরষ্কার লাভ করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন বাংলা ভাষা এবং বাঙালীর এই সম্মানে অভিভূত হয়ে সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-
‘রবির অর্ঘ্য পাঠিয়েছে আজ
ধ্র“বতারা প্রতিবাসী
প্রতিভার এই পূন্য পূজায়
সপ্ত সাদার মিলিল আসি ॥’
ছন্দের জাদুকর হিসাবে খ্যাত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এছাড়াও লিখেছেন-
‘ধন্য কবি, কাব্যলোকের ছত্রপতি, ধন্য তুমি
ধন্য তুমি, ধন্য তোমার জননী ও জন্মভূমি,
বঙ্গভূমি ধন্য তোমায় ধরি অঙ্কে করি,
ধন্য ভারত আর ধন্য জগৎ আর জগতের নিত্য রবি ॥’
যেখানে গুণিজনরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে কাব্যলোকের ছত্রপতি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সেখানে সেই মহাপুরুষ সম্বন্ধে কিইবা লেখার মতা আমাদের আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছত্রপতি স্বীকৃতি পেলেও তিনি কখনই নিজেকে ছত্রপতি হিসাবে মনে করেননি। যা তার লেখা কাব্য প্রমাণ করে দেয়। কথা শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে কবি লিখেছেন-
“যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে
তি তার তি নয় মৃত্যুর শাসনে।
দেশের হৃদয় থেকে নিল যারে হরি
দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে ধরি ॥”
আবার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘ধুমকেতু’ পত্রিকা বের করার সময়, রবীন্দ্রনাথ ‘ধুমকেতুর’ উদ্দেশ্যে এক শুভেচ্ছা বার্তায় লিখেছিলেন-
‘আয় চলে আয়রে ধুমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু
দুর্দিনের এই দুর্গ শিখরে,
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
অলুুণে তিলক রেখা।
জাতকের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দেবে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন।’
রবীন্দ্র ইতিহাসে কোথাও কি মনে হয় তিনি নিজেকে কাব্য লোকের ছাত্রপতি মনে করতেন? নজরুল ইসলামের কন্ঠে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির আবৃত্তি শুনে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে পরম উৎসাহে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন- ‘সত্যিই তুমি আমায় হত্যা করবে। তোমার মধ্যে আমি জগৎ আলোকিত করার জ্যোতি দেখতে পাচ্ছি।’

এই হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। যিনি প্রতিভার কাছে হত্যার ভয়ে ভীত নন। বরং সাহিত্যাকাশে তাকে যেন সত্যি হত্যা করতে পারে, সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়েছেন বহুজনকে, বহুবার। তাঁর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী। উনবিংশ শতাব্দির শেষার্ধ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলাদেশ যে সকল মনীষীর আবির্ভাব হয়েছে, যাদের প্রতিভায় শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র উপমহাদেশ গৌরবান্বিত। তাদের মধ্যে অন্যতম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাকিস্তান আমলে বাংলা সংস্কৃতি চর্চার েেত্র পাক সরকার রবীন্দ্র-নজরুল দ্বন্দ্ব খাড়া করে বিভাজন তৈরির অপকৌশল গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বাঙালীদের মনে বিভাজন সৃষ্টি করতে সম হয়নি। কিন্তু কষ্ট হয় তখন, যখন দেখি স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর পরেও কতিপয় পন্ডিত ব্যক্তি, স্বার্থানেষী আঁতেল সমাজ এই মহামানবদের সাম্প্রদায়িকতার বন্ধনে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। কষ্ট হয় তখন, যখন দেখি কলামিস্টরা তাদের লেখনীর মধ্য দিয়ে এই মহামানবদের ওজন করার চেষ্টা করেন। সম্প্রতি একজন কলামিষ্টের লেখা পরে আমি হতবাক। তিনি লিখেছেনÑ
“রবীন্দ্রনাথ প্রেমের কবি-নজরুল বিদ্রোহী, রবীন্দ্রনাথের কাব্যে কল্পনার প্রাধন্য বেশী-নজরুল বাস্তব, রাজপথে দাবী আদায়ের রাজনীতিতে রবীন্দ্রপ্রতিভা সুপ্ত-নজরুল লড়াকু সৈনিক। রবীন্দ্রনাথের গানের সংখ্যা সর্বসমেত ২০০০ হাজার-আর নজরুল ইসলামের আজ পর্যন্ত যা সংগৃহীত হয়েছে তা রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ১০০০ বেশী। এরকম আরো অনেক কিছু। তার লেখার সকল বাক্য জুরেই ছিল পরিমাপ করার একটা নিখুঁত চেষ্টা। আশ্চর্য লাগে, এ সকল লেখকরা এই মহামানবদের সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞান সঞ্চয় করে ওজন করার চেষ্টা করছেন? যাদের সঞ্চিত জ্ঞানের বাইরে রয়েছে অনেক অজানা! ”
১৯০৫ সালে বৃটিশ সরকার যখন বাংলাকে দুই ভাগে ভাগকরার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। রবীন্দ্রনাথই অনশন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। বাংলার মুকুহীন সম্রাট সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরজ্ঞন দাশ, অশ্বিনীকুমার দও, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেকেই সেদিন দাবী আদায়ের লে রাজপথে নেমে এসেছিলেন জনতার মিছিলে। সেই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বীরদর্পে স্বরচিত গান গেয়ে উত্তাল করেছিলেন বিশ্ব কবি-
‘বাংলার মাটি বাংলার জল
বাংলার বায়ু বাংলার ফল
পূণ্য হউক, পূণ্য হউক, পূণ্য হউক
হে ভগবান।
বাঙালীর প্রাণ বাঙালির মন
বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন
এক হউক, এক হউক, এক হউক
হে ভগবান!’
রাজপথে রবীন্দ্রনাথ এরকম বহুবার দাবী আদায়ের সংগ্রামে বিদ্রোহ করেছেন। আসলে বিদ্রোহ যে কত ভাবে প্রকাশ করা যায়, তা যিনি না বোঝেন তারা কি করে এই মহামানবদের ওজন পরিমাপ করার ধৃষ্টতা দেখান? যদিও হীন মানসিকতার সমালোচক যেমন বর্তমানে আছে। তেমনি রবীন্দ্রনাথ স্ব-শরীরে যখন পৃথিবীতে ছিলেন তখনও ছিল। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে লিখেছেনÑ
‘‘লোকে অনেক সময়ই আমার সম্বন্ধে সমালোচনা করেন ঘরগড়া মত নিয়ে। বলে, উনিতো ধনী ঘরের ছেলে। রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছেন। পল্লী গ্রামের কথা উনি কি জানেন? আমি বলতে পারি আমার চেয়ে কম জানেন তাঁরা। যারা এমন কথা বলেন। কী দিয়ে জানেন তাঁরা? অভ্যাসের জড়তার ভেতর দিয়ে কি জানা যায়? যথার্থ জানায় ভালবাসা। কুঁড়ির মধ্যে যে কীট জন্মেছে সে জানেনা ফুলকে। জানে, বাইরে থেকে যে পেয়েছে আনন্দ। আজ বললে অহংকারে মতো শোনাবে, তবুও বলব- আমাদের দেশের খুব অল্প লেখকই রসবোধের চোখে বাংলাদেশ দেখেছেন।”

বলা হয়ে থাকে ইতিহাস কালের সাী। ইতিহাস আমাদের অতীত। পূর্ব পুরুষদের জানার সুযোগ করে দেয় ইতিহাস। আজ যা বর্তমান কাল তা ইতিহাস। কিন্তু সমাজের কর্ণধারগণ এই মহামানবদের সর্ম্পকে যা জানানোর চেষ্ঠা করছেন তা কি সত্যি ইতিহাস? ছোটবেলা থেকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল্ চল্ চল্’ কবিতায় পড়ে এসেছি, কবি লিখেছেন-
“নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব মহাশ্মশান,
আমরা দানিব নতুন প্রাণ
বাহুতে নবীন বল!”
কিন্তু বর্তমানে একাধিক বইতে লেখা হয়েছে-
“নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব গোরস্থান”
সভ্যসমাজ কি বলবেন? এই বই গুলি কাল ইতিহাস নয়? আজকের প্রজন্ম সঠিক শব্দটিকে কাল ভুল বলবে না? তদরূপ ছোট থেকে জেনে এসেছি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ সাল ২৫ শে বৈশাখ, ইংরেজী ১৮৬১ সনের ৭ই মে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু বর্তমানে বাংলা সাল ও তারিখ ঠিক থাকলেও পাঠ্যপুস্তকে ৬ই মে লেখা হচ্ছে। বিদগ্ধ ও বিদুষীগণ বলবেন? বর্তমান প্রজন্ম কোনটিকে সঠিক বলে জানবো?
ইতিহাস সাখ্য দেয়, রক্তমাংসের গড়া মানুষের জন্ম একদিনই হয়। হয়ত সকাল অথবা রাত। কিংবা দুপুর, বিকেল অথবা সন্ধ্যা। কিন্তু ইতিহাস এই সাখ্য দেয় না- যে মানুষটি আজ মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েছে, সে আবার কাল ভূমিষ্ট হয়েছে।
আজ ২৫ শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আমরা বাঙালিরা ‘( )” দিয়ে লিখি বাংলাদেশ। আবার কাল ২৫ শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আমরা বাঙালিরাই ‘( )” দিয়ে লিখি ভারত। অথচ আমরা এক জাতি বাঙালী। কেহ কি ভেবে দেখছেন ‘সমাজ কিংবা রাষ্ট্র’। আজকের শিশু যখন প্রশ্ন করবে রবীন্দ্রনাথের জন্ম কি ভাবে দু’দিন হল? বর্তমান বইয়ের লেখা সঠিক না পূর্বের? কি উত্তর দেব! নাকি সঠিক উত্তর দিতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতে নিজের গাল নিজে চাপড়াবো? যিনি যে ভাবেই এই মহামানবদের ‘উঁচু-নিচু, ছোট-বড়’ করে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেন না কেন, ভুলে গেলে চলবে না ‘মাথা সব সময় শরীরের উঁচু স্থান দখল করেই থাকে। তার স্থান পরিবর্তন করলে মানবদেহে প্রাণ থাকে না।’

আসলে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন মহৎ প্রাণের মানুষ। তিনি বিশ্বকবি এবং কবিদের কবি। তাঁর সৃষ্টির গৌরবে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার পরিপূর্ণ। রবীন্দ্র প্রতিভা বিশ্বের বিরাট বিষ্ময়। তিনি শুধু কবিই নন। একাধারে নাট্যকার, ছোট গল্পের শ্রেষ্ঠ শিল্পী, উপন্যাসিক, গীতিকার এবং সুরকার। এছাড়া সাহিত্য ও সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি, ভ্রমণ কাহিনী সংক্রান্ত একাধিক গ্রন্থ তাঁর আছে। রবীন্দ্রনাথের একাধিক রচনার ইংরেজী তরজমাও হয়েছে। যে তরজমাগুলি অধিকাংশই তিনি নিজে করেছেন। এছাড়াও তাঁর আর একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। বাংলাদেশ এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীতই শুধু তাঁর লেখা নয়, শ্রীলংকাসহ আরো অনেক দেশের জাতীয় সঙ্গীতও তাঁর লেখা। সুতরাং প্রাচুর্য ও বৈচিত্রের দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের তুলনা। পৃথিবীর আর কারো সঙ্গেই তাঁর তুলনা চলে না। রবীন্দ্র প্রতিভা বিচিত্রমুখী হলে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি কবি। তাঁর আসন সকল নীচতা, হীনতা, সাম্প্রদায়ীকতার উর্দ্ধে।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে একটাই প্রার্থনা, আমি আমার বাঙালী জাতির দ্বি-বিভক্তি চাই না। হারাতে চাই না সঠিক ইতিহাস। দাঁড়াতে চাই না মিথ্যাকে সঙ্গী করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি। ইতিহাসকে ফিরে পেতে চাই স্ব-মহিমায়। দেরযুগ আগে সামরিক শাষকের মৌলবাদী মানসিকতার সৃষ্টি দিন পঞ্জিকার ‘( )’ ভেঙ্গে ফিরে পেতে চাই বাঙালী জাতির এক আত্মা। বাংলা নববর্ষসহ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের মত মহামানবদের স্মরণীয় দিনগুলি হোক বাঙালি জাতির মিলন উৎসব। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত্ব হোক-‘আমরা সবাই বাঙালী’।
লেখকঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী।