Pages

Tuesday, 4 June 2013

মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও চেতনার প্রভাতফেরি

                                                               -অপর্ণা সাহা

“আজ আমি শোকে বিহ্বল নই,
আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই,
আজ আমি রক্তের গৌরবে অভিষিক্ত ॥”
প্রত্যেক দেশ ও জাতির নিজস্ব ভাষা থাকে। আর তাই হলো মাতৃভাষা। মানুষের ভাব প্রকাশের বাহন। মায়ের মুখ থেকে শেখা ভাষার বিকল্প কিছু নেই। মাতৃভাষাতেই মনের ভাব সম্পূর্ণ বোধগম্যভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। যা অন্য ভাষাতে কখনোই প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। তাই ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রতিটি মানুষের বাঞ্চনীয়।

আজ ভাষা আন্দোলনের ৬১ বছর। কিন্তু আমি এ প্রজন্মের একজন। রাজপথে শুনতে হয়নি সেই শ্লোগান-“রাষ্ট্র ভাষা-রাষ্ট্র ভাষা, বাংলা চাই-বাংলা চাই।” দেখতে হয়নি ভাষার জন্য রক্তে রঞ্জিত রাজপথ। মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েই আমি গর্বিত এক নাগরিক। আমি বাংলাদেশী, আমি বাঙালি, আমার নিজস্ব ভাষা বাংলা। অথচ বায়ান্নতে, তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তি হত্যা করেছিল তাদের, যারা এই দাবী করেছিলেন যে, বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হোক। পাকিস্তানীরা আমাদের উপদেশ দিয়েছিল, পাকিস্থানী হয়ে যেতে। কিন্ত আমরা হইনি। উপরন্ত সেদিন বাঙালি তাদের বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছে জোরের সঙ্গে। তাতে পাকিস্তানিরা ুব্ধ ও শঙ্কিত হয়ে অস্ত্র দিয়ে আমাদের পাকিস্তানি করতে চেয়েছিল। সেই প্রয়াসও তাদের শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এ কথা আমরা সকলে জানি। আবার এটাও জানি, বিশ্বের বুকে একমাত্র বাঙালিই জানে মায়ের ভাষায় কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা কত কঠিন। অ-অজগর আসছে তেড়ে, আ-আমটি আমি খাব পেরে, পড়তে না পারার কষ্ট। ভাষা আন্দোলনের ষাট বছরে দাঁড়িয়ে আমরা কি করছি? যখন সারাবিশ্ব আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করছে এই দিনটি, বিশ্ব যখন তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, আমরা মায়ের ভাষা বলতে কি বুঝি? আদৌকি বুঝি, মায়ের ভাষা কাকে বলে?

এ প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসাবে আমি বিষ্মিত হই, যদি বুঝতাম তাহলে স্বাধীনতার পর থেকে অদ্য পর্যন্ত, পাহাড়ী জনগোষ্ঠির উপর রাষ্ট্র এবং সমাজ, ঐ পাকিন্তানীদের মত একই আচরণ করত না। কেন তাদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে বাঙালী হয়ে যেতে? চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং পটুয়াখালীর সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় কিছু অ-বাঙালি জাতির বাস, আমরা তাদের উপজাতি বলি। কেন উপজাতি বলি, সত্যিই আমি বুঝতে পারিনা। অথচ তাদেরও আমাদের মত ভাষা আছে। নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, সমৃদ্ধ লোকাচার আছে। তাদের জীবনেও সৌন্দর্য্য, সততা, উত্তাপ, শিল্প, পরিবার, বিবাহ, জন্ম-মৃত্যু, অন্যান্য সকল আচার আছে। তাদের জীবনেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শাষন আছে। আছে অর্থনীতি, সমাজনীতি ও রাজনীতি। যা বাঙালিরও আছে। তাহলে তারা উপজাতি কেন-আমরাই বা জাতি কেন? তা কি সংখ্যার বিচারে? ওরা কয়েক লাখ, আমরা কয়েক কোটি? ভেবে দেখবেন রাষ্ট্র এবং সমাজ, পাহাড়ী জাতিগুলোর মাতৃভাষার জায়গায় যখন বাংলা চালু হয়, তারা বাঙালির মত সংগঠিত হতে পারেনা, কেননা তারা সংখ্যায় অল্প। তাদের প্রতিরোধও দুর্বল। এক সময় বাংলাকে তাদের মেনে নিতে হয়। কিন্তু বাংলা কেন তাদের মাতৃভাষার বিকাশ রুদ্ধ করবে?

পাহাড়ীরা বাংলা শিখবে, আমরা যেমন ইংরেজী শিখছি। বাংলা শিা আবশ্যিক থাকবে-যেমন ইংরেজী আবশ্যক থাকে। কিন্তু তাদের শিশুরা স্কুলে তাদের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করবে, কারণ ভাষাই তাদের জ্ঞানচর্চাকে ইতিহাস ঐতিহ্য এবং আবেগের সঙ্গে মেলাবে। আমরা যদি আমাদের স্বার্থে তাদের উপর বাংলা চাপিয়ে দেই, তাহলে সেটা হবে অন্যায়। যে অন্যায়টা পাকিন্তানীরা আমাদের সাথে করেছিল। বিংশ শতকে পা রেখে আমরা তিন’শ, পাঁচ’শ বছর আগের চিন্তা-চেতনায় কেন স্থির থাকবো? কেন এখনো উপজাতির তত্ত্ববলে আকড়ে থাকবো। কেন চাকমা, সাঁওতাল, মনিপুরী জনগোষ্ঠিকে উপজাতি বলে ুদ্র করে রাখব? এই যদি হয় মায়ের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। তাহলে বিশ্ব আমাদের কাছ থেকে কি শিখবে? তারা কি আমাদের মা করবে? আমরাই কি মা করতে পরবো নিজেদের?

বলা হয়ে থাকে ইতিহাস কালের স্বাী। ইতিহাস আমাদের অতীত। পূর্ব পুরুষদের জানার সুযোগ করে দেয় ইতিহাস। আজ যা বর্তমান কাল তা ইতিহাস। কিন্তু সমাজের কর্ণধারগণ বাঙালী সংস্কৃতি, বাঙালীর চিরন্তন শ্রদ্ধাবোধ ভুলে এ কোন ইতিহাস সৃষ্টি করছেন?

বাঙালি সংস্কৃতি ভুলে ১২টা ১ মিনিটে পুষ্পমাল্য অর্পণ। পুষ্পমাল্য অর্পণের নামে ছবি তোলার হিড়িক। শ্রদ্ধাঞ্জলির মৌন মিছিলে রাজনৈতিক দলের শ্লোগান। সভ্য সমাজ কি বলবেন? এগুলি কাল ইতিহাস নয়? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুলটাকে কাল সঠিক বলবে না? বাঙালি সংস্কৃতি রাত ১২টা ১মিনিটে দিনের প্রথম প্রহর বিবেচনা করে না। আবহমান বাংলার দিনের শুরু প্রত্যুষ আর দিনের অবসান সন্ধ্যা। কিন্তু দেরযুগ আগে সামরিক শাসক নিজের নিরাপত্তা বিচারে একুশের প্রথম প্রহর নাম দিয়ে রাত ১২টা ১মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের রেওয়াজ চালু করে। একে বিনা প্রশ্নেই মেনে নেয় সব শ্রেণীর মানুষ! নাগরিক জীবনে দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায় একুশের আবেগ। অথচ বায়ান্নর পর থেকে একুশের প্রত্যুষ প্রভাতফেরির মধ্যদিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন একুশের মহিমাকে আলাদা উজ্জ্বলতা দিয়েছে। কিন্তু আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে এই দিনটি পালন করছে সারাবিশ্ব। পাশ্চাত্য যেখানে আমাদের অনুসরণ করে চলবে, সেখানে পাশ্চাত্যের অনুসরনেই মাঝরাতে চলে একুশের তর্পণ!


ভাষা আন্দোলনে ষাট বছরে দাঁড়িয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে একটাই প্রার্থনা, আমি আমার বাঙালী জাতির দ্বি-বিভক্তি চাই না। হারাতে চাই না সঠিক ইতিহাস। দাঁড়াতে চাই না মিথ্যাকে সঙ্গী করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি। একুশের চেতনাকে ফিরে পেতে চাই স্ব-মহিমায়। রাত ১২টা ১এর বৈরী সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে, ফিরে পেতে চাই কাকডাকা ভোরে ফুল হাতে নগ্ন পায়ে হেটে চলা প্রভাতফেরি।
লেখক ঃ  সাংস্কৃতিককর্মী।

No comments:

Post a Comment