Pages

Monday, 3 June 2013

বিশ্বকবি এবং কবিদের কবি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর
পূন্য হল অঙ্গমম, ধন্য হল অন্তর,
সুন্দর হে সুন্দর’
কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি, কবি চায় প্রীতি, কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ, সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে। যেমন স্বীকার করেছিলেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলির মধ্যে দিয়ে যখন এশিয়া মহাদেশের সর্বপ্রথম নোবেল পুরষ্কার লাভ করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন বাংলা ভাষা এবং বাঙালীর এই সম্মানে অভিভূত হয়ে সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-
‘রবির অর্ঘ্য পাঠিয়েছে আজ
ধ্র“বতারা প্রতিবাসী
প্রতিভার এই পূন্য পূজায়
সপ্ত সাদার মিলিল আসি ॥’
ছন্দের জাদুকর হিসাবে খ্যাত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এছাড়াও লিখেছেন-
‘ধন্য কবি, কাব্যলোকের ছত্রপতি, ধন্য তুমি
ধন্য তুমি, ধন্য তোমার জননী ও জন্মভূমি,
বঙ্গভূমি ধন্য তোমায় ধরি অঙ্কে করি,
ধন্য ভারত আর ধন্য জগৎ আর জগতের নিত্য রবি ॥’
যেখানে গুণিজনরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে কাব্যলোকের ছত্রপতি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সেখানে সেই মহাপুরুষ সম্বন্ধে কিইবা লেখার মতা আমাদের আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছত্রপতি স্বীকৃতি পেলেও তিনি কখনই নিজেকে ছত্রপতি হিসাবে মনে করেননি। যা তার লেখা কাব্য প্রমাণ করে দেয়। কথা শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে কবি লিখেছেন-
“যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে
তি তার তি নয় মৃত্যুর শাসনে।
দেশের হৃদয় থেকে নিল যারে হরি
দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে ধরি ॥”
আবার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘ধুমকেতু’ পত্রিকা বের করার সময়, রবীন্দ্রনাথ ‘ধুমকেতুর’ উদ্দেশ্যে এক শুভেচ্ছা বার্তায় লিখেছিলেন-
‘আয় চলে আয়রে ধুমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু
দুর্দিনের এই দুর্গ শিখরে,
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
অলুুণে তিলক রেখা।
জাতকের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দেবে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন।’
রবীন্দ্র ইতিহাসে কোথাও কি মনে হয় তিনি নিজেকে কাব্য লোকের ছাত্রপতি মনে করতেন? নজরুল ইসলামের কন্ঠে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির আবৃত্তি শুনে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে পরম উৎসাহে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন- ‘সত্যিই তুমি আমায় হত্যা করবে। তোমার মধ্যে আমি জগৎ আলোকিত করার জ্যোতি দেখতে পাচ্ছি।’

এই হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। যিনি প্রতিভার কাছে হত্যার ভয়ে ভীত নন। বরং সাহিত্যাকাশে তাকে যেন সত্যি হত্যা করতে পারে, সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়েছেন বহুজনকে, বহুবার। তাঁর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী। উনবিংশ শতাব্দির শেষার্ধ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলাদেশ যে সকল মনীষীর আবির্ভাব হয়েছে, যাদের প্রতিভায় শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র উপমহাদেশ গৌরবান্বিত। তাদের মধ্যে অন্যতম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাকিস্তান আমলে বাংলা সংস্কৃতি চর্চার েেত্র পাক সরকার রবীন্দ্র-নজরুল দ্বন্দ্ব খাড়া করে বিভাজন তৈরির অপকৌশল গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বাঙালীদের মনে বিভাজন সৃষ্টি করতে সম হয়নি। কিন্তু কষ্ট হয় তখন, যখন দেখি স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর পরেও কতিপয় পন্ডিত ব্যক্তি, স্বার্থানেষী আঁতেল সমাজ এই মহামানবদের সাম্প্রদায়িকতার বন্ধনে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। কষ্ট হয় তখন, যখন দেখি কলামিস্টরা তাদের লেখনীর মধ্য দিয়ে এই মহামানবদের ওজন করার চেষ্টা করেন। সম্প্রতি একজন কলামিষ্টের লেখা পরে আমি হতবাক। তিনি লিখেছেনÑ
“রবীন্দ্রনাথ প্রেমের কবি-নজরুল বিদ্রোহী, রবীন্দ্রনাথের কাব্যে কল্পনার প্রাধন্য বেশী-নজরুল বাস্তব, রাজপথে দাবী আদায়ের রাজনীতিতে রবীন্দ্রপ্রতিভা সুপ্ত-নজরুল লড়াকু সৈনিক। রবীন্দ্রনাথের গানের সংখ্যা সর্বসমেত ২০০০ হাজার-আর নজরুল ইসলামের আজ পর্যন্ত যা সংগৃহীত হয়েছে তা রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ১০০০ বেশী। এরকম আরো অনেক কিছু। তার লেখার সকল বাক্য জুরেই ছিল পরিমাপ করার একটা নিখুঁত চেষ্টা। আশ্চর্য লাগে, এ সকল লেখকরা এই মহামানবদের সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞান সঞ্চয় করে ওজন করার চেষ্টা করছেন? যাদের সঞ্চিত জ্ঞানের বাইরে রয়েছে অনেক অজানা! ”
১৯০৫ সালে বৃটিশ সরকার যখন বাংলাকে দুই ভাগে ভাগকরার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। রবীন্দ্রনাথই অনশন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। বাংলার মুকুহীন সম্রাট সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরজ্ঞন দাশ, অশ্বিনীকুমার দও, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেকেই সেদিন দাবী আদায়ের লে রাজপথে নেমে এসেছিলেন জনতার মিছিলে। সেই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বীরদর্পে স্বরচিত গান গেয়ে উত্তাল করেছিলেন বিশ্ব কবি-
‘বাংলার মাটি বাংলার জল
বাংলার বায়ু বাংলার ফল
পূণ্য হউক, পূণ্য হউক, পূণ্য হউক
হে ভগবান।
বাঙালীর প্রাণ বাঙালির মন
বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন
এক হউক, এক হউক, এক হউক
হে ভগবান!’
রাজপথে রবীন্দ্রনাথ এরকম বহুবার দাবী আদায়ের সংগ্রামে বিদ্রোহ করেছেন। আসলে বিদ্রোহ যে কত ভাবে প্রকাশ করা যায়, তা যিনি না বোঝেন তারা কি করে এই মহামানবদের ওজন পরিমাপ করার ধৃষ্টতা দেখান? যদিও হীন মানসিকতার সমালোচক যেমন বর্তমানে আছে। তেমনি রবীন্দ্রনাথ স্ব-শরীরে যখন পৃথিবীতে ছিলেন তখনও ছিল। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে লিখেছেনÑ
‘‘লোকে অনেক সময়ই আমার সম্বন্ধে সমালোচনা করেন ঘরগড়া মত নিয়ে। বলে, উনিতো ধনী ঘরের ছেলে। রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছেন। পল্লী গ্রামের কথা উনি কি জানেন? আমি বলতে পারি আমার চেয়ে কম জানেন তাঁরা। যারা এমন কথা বলেন। কী দিয়ে জানেন তাঁরা? অভ্যাসের জড়তার ভেতর দিয়ে কি জানা যায়? যথার্থ জানায় ভালবাসা। কুঁড়ির মধ্যে যে কীট জন্মেছে সে জানেনা ফুলকে। জানে, বাইরে থেকে যে পেয়েছে আনন্দ। আজ বললে অহংকারে মতো শোনাবে, তবুও বলব- আমাদের দেশের খুব অল্প লেখকই রসবোধের চোখে বাংলাদেশ দেখেছেন।”

বলা হয়ে থাকে ইতিহাস কালের সাী। ইতিহাস আমাদের অতীত। পূর্ব পুরুষদের জানার সুযোগ করে দেয় ইতিহাস। আজ যা বর্তমান কাল তা ইতিহাস। কিন্তু সমাজের কর্ণধারগণ এই মহামানবদের সর্ম্পকে যা জানানোর চেষ্ঠা করছেন তা কি সত্যি ইতিহাস? ছোটবেলা থেকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল্ চল্ চল্’ কবিতায় পড়ে এসেছি, কবি লিখেছেন-
“নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব মহাশ্মশান,
আমরা দানিব নতুন প্রাণ
বাহুতে নবীন বল!”
কিন্তু বর্তমানে একাধিক বইতে লেখা হয়েছে-
“নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব গোরস্থান”
সভ্যসমাজ কি বলবেন? এই বই গুলি কাল ইতিহাস নয়? আজকের প্রজন্ম সঠিক শব্দটিকে কাল ভুল বলবে না? তদরূপ ছোট থেকে জেনে এসেছি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ সাল ২৫ শে বৈশাখ, ইংরেজী ১৮৬১ সনের ৭ই মে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু বর্তমানে বাংলা সাল ও তারিখ ঠিক থাকলেও পাঠ্যপুস্তকে ৬ই মে লেখা হচ্ছে। বিদগ্ধ ও বিদুষীগণ বলবেন? বর্তমান প্রজন্ম কোনটিকে সঠিক বলে জানবো?
ইতিহাস সাখ্য দেয়, রক্তমাংসের গড়া মানুষের জন্ম একদিনই হয়। হয়ত সকাল অথবা রাত। কিংবা দুপুর, বিকেল অথবা সন্ধ্যা। কিন্তু ইতিহাস এই সাখ্য দেয় না- যে মানুষটি আজ মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েছে, সে আবার কাল ভূমিষ্ট হয়েছে।
আজ ২৫ শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আমরা বাঙালিরা ‘( )” দিয়ে লিখি বাংলাদেশ। আবার কাল ২৫ শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আমরা বাঙালিরাই ‘( )” দিয়ে লিখি ভারত। অথচ আমরা এক জাতি বাঙালী। কেহ কি ভেবে দেখছেন ‘সমাজ কিংবা রাষ্ট্র’। আজকের শিশু যখন প্রশ্ন করবে রবীন্দ্রনাথের জন্ম কি ভাবে দু’দিন হল? বর্তমান বইয়ের লেখা সঠিক না পূর্বের? কি উত্তর দেব! নাকি সঠিক উত্তর দিতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতে নিজের গাল নিজে চাপড়াবো? যিনি যে ভাবেই এই মহামানবদের ‘উঁচু-নিচু, ছোট-বড়’ করে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেন না কেন, ভুলে গেলে চলবে না ‘মাথা সব সময় শরীরের উঁচু স্থান দখল করেই থাকে। তার স্থান পরিবর্তন করলে মানবদেহে প্রাণ থাকে না।’

আসলে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন মহৎ প্রাণের মানুষ। তিনি বিশ্বকবি এবং কবিদের কবি। তাঁর সৃষ্টির গৌরবে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার পরিপূর্ণ। রবীন্দ্র প্রতিভা বিশ্বের বিরাট বিষ্ময়। তিনি শুধু কবিই নন। একাধারে নাট্যকার, ছোট গল্পের শ্রেষ্ঠ শিল্পী, উপন্যাসিক, গীতিকার এবং সুরকার। এছাড়া সাহিত্য ও সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি, ভ্রমণ কাহিনী সংক্রান্ত একাধিক গ্রন্থ তাঁর আছে। রবীন্দ্রনাথের একাধিক রচনার ইংরেজী তরজমাও হয়েছে। যে তরজমাগুলি অধিকাংশই তিনি নিজে করেছেন। এছাড়াও তাঁর আর একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। বাংলাদেশ এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীতই শুধু তাঁর লেখা নয়, শ্রীলংকাসহ আরো অনেক দেশের জাতীয় সঙ্গীতও তাঁর লেখা। সুতরাং প্রাচুর্য ও বৈচিত্রের দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের তুলনা। পৃথিবীর আর কারো সঙ্গেই তাঁর তুলনা চলে না। রবীন্দ্র প্রতিভা বিচিত্রমুখী হলে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি কবি। তাঁর আসন সকল নীচতা, হীনতা, সাম্প্রদায়ীকতার উর্দ্ধে।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে একটাই প্রার্থনা, আমি আমার বাঙালী জাতির দ্বি-বিভক্তি চাই না। হারাতে চাই না সঠিক ইতিহাস। দাঁড়াতে চাই না মিথ্যাকে সঙ্গী করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি। ইতিহাসকে ফিরে পেতে চাই স্ব-মহিমায়। দেরযুগ আগে সামরিক শাষকের মৌলবাদী মানসিকতার সৃষ্টি দিন পঞ্জিকার ‘( )’ ভেঙ্গে ফিরে পেতে চাই বাঙালী জাতির এক আত্মা। বাংলা নববর্ষসহ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের মত মহামানবদের স্মরণীয় দিনগুলি হোক বাঙালি জাতির মিলন উৎসব। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত্ব হোক-‘আমরা সবাই বাঙালী’।
লেখকঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী।

No comments:

Post a Comment