Pages

Monday, 3 June 2013

আমরা সবাই বাঙালি


নববর্ষ আসলে আমরা ভাগ করে নিতে চাই বাংলা সংস্কৃতির আনন্দ। নগর জীবনে কৃষকের ফসল তোলার আনন্দ। এই সংস্কৃতি কৃষকের নয় এই সংস্কৃতি শহুরে জীবনে হাফিয়ে ওঠা মানুষের চিত্তবিনোদন। নগর সংস্কৃতির যে মূলভিত্তি থেকে তৈরি হয়েছে বা আমরা বলতে পারি নগর সংস্কৃতির মানুষজন যে অবস্থান থেকে উঠে এসেছে তার ঋণ স্বীকার করে নেয়ার এক অনবদ্ধ আয়োজন বৈকি অন্য কিছু নয়। পুরনো স্মৃতিকে স্মরণ রাখার জন্য তৈরী করছি এ সংস্কৃতি বা আমরা যে একসময় কৃষকের সন্তান ছিলাম সে কথাই মনে করতে চাই বলেই বার বার সেই পান্তা, সেই আটপৌড়ে জীবন, সেই নবান্নের সিন্নি, পায়েস, পিঠা-পুলি, সেই জংলিপাড়ের মোটা কাপড় পরে বলতে চাই ‘আমরা বাঙালি ছিলাম রে’।
অথচ আমাদের এই বাঙালি সেজে ওঠা বর্তমান প্রজন্ম কতটুকু জানে অতীত, আর কতটুকুই বা জানে বর্তমান! অতীত ইতিহাসটা এরকম ‘সম্রাট আকবরের সময় কৃষকদের থেকে কর আদায় করা হতো হিজরী সন অনুযায়ী। কিন্তু লুনার ক্যালেন্ডার (চন্দ্র বছর) অনুস্মরণ করা হিজরী সনের প্রথম দিন একেক বছর একেক সময়ে আসতো। ফলে অনেক সময় কৃষকদের ফসলহীন মৌসুমে কর দিতে হতো যা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যেতো। সম্রাট আকবর এই সমস্যার সমাধান করার জন্য সে সময়ের বিশিষ্ট পন্ডিত ফতেউল্লাহ সিরাজীকে একটা নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির আদেশ দেন। পরবর্তিতে ফতেউল্লাহ সিরাজী হিজরী ক্যালেন্ডার এবং জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের মধ্যে একটা ‘স্যুধ ট্রানজেশন’ ঘটন অর্থাৎ লুনার ধারণা অনুস্মরণ করা হিজরী সনকে জর্জিয়ান ধারণায় রূপান্তর করেন। যদিও এই ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করা হয় ১৫৮৪ খৃষ্টাব্দের ১০ (অথবা মতান্তরে ১১) মার্চ, তবে হিসেব গণনা করা শুরু করা হয় (ব্যাক ডেট) ১৫৫৬ সন থেকে, যা আকবরের সিংহাসন আরোহনের সন। ঐ বছরের (১৫৫৬) হিজরী সনকে ফতেউল্লাহ সিরাজীর তৈরি করা জর্জিয়ান হিসাব অনুযায়ী বাংলা বর্ষ গণনা শুরু হয়। সে হিসেবে পেছন দিকে গুণতে থাকলে বাংলা ৯৬৩ সনের আগে আর কোনো সন পাওয়া সম্ভব নয়। আরেকটা বিষয় ল্য করে থাকবেন হয়তো পাঠক, বাংলা সন এবং হিজরী সন খুব কাছাকাছি বিরাজ করছে। বর্তমানে ১৪৩০ হিজরী সন চলছে এবং বাংলা শুরু হলো ১৪১৬। আজ থেকে ৪৫৩ বছর আগে ৩৫৫ দিনের (প্রায়) হিজরী সনকে ৩৬৫ দিনের (প্রায়) বাংলা সনে রূপান্তর করা হয়।
একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বাংলাদেশ পহেলা বৈশাখ সব সময় ১৪ এপ্রিল পড়ে; কিন্তু ভারতে সেটা কখনও ১৪ আবার কখনও ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। অথচ, ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের সকল বাঙালী একই দিনে নেচে উঠত বৈশাখের রংয়ের ছটায়। কিন্তু ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামল বাঙালিকে করে দেয় দ্বিধাবিভক্ত। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারী থেকে চালু হয় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রণীত বাংলা বর্ষপঞ্জি। বর্তমান চলমান বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিন হয়। শেষের ৭ মাস ৩০ দিন হয়। (৫ গুণ ৩১= ১৫৫ দিন, ৭ গুণ ৩০= ২১০ দিন)। ১৫৫ দিন + ২১০ দিন= ৩৬৫ দিন বা এক বছর। লিপইয়ার বা মূল বছরে চৈত্র মাস হবে ৩১ দিনে। অর্থাৎ লিপইয়ার বাংলা বছর হয় ৩৬৬ দিনে। লিপইয়ার বলতে সেই বছর বুঝায়, যে বছরকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে নিঃশেষে বিভাজ্য হয়। হারিয়ে যায় সমগ্র বাঙালির এক সাথে নেচে ওঠা। বাঙালি জীবনে দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায় নববর্ষের আবেগ। বিনা প্রশ্নেই মেনে নেয় সব শ্রেণীর মানুষ! স্বৈরশাসক তার স্বৈরাচারী মনোভাব শুধু বাঙালি জীবনের এই অধ্যায়ে চাপিয়ে দিয়েই ্যান্ত হননি, নিজের নিরাপত্তা বিচারে একুশের প্রথম প্রহর নাম দিয়ে রাত ১২টা ১মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের রেওয়াজ চালু করে। অথচ বাঙালি সংস্কৃতি রাত ১২টা ১মিনিটে দিনের প্রথম প্রহর বিবেচনা করে না। আবহমান বাংলার দিনের শুরু প্রত্যুষ আর দিনের অবসান সন্ধ্যা। নাগরিক জীবনে দ্বি-খন্ডিত করে ফেলা হয় একুশের আবেগ। যা আজও চলমান!
আরেকটি বিষয় এখানে একটু ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনবোধ করছি। প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের সময় রাত ১২.১ মিনিটে মানুষ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়। এই রীতিটা সম্পূর্ণ ভুল। জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিন শুর হয় রাত ১২টার পর থেকে কিন্তু বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিন শুর হয় সূর্যদ্বয়ের পর। ঠিক যেমনটা হিজরী ক্যালেন্ডারে দিন শুর হয় সূর্যাস্তের পর থেকে। ফলে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো উচিৎ সকালে সূর্যোদয়ের সময়। শুভেচ্ছা যখন বাংলা নববর্ষের জানাচ্ছি তখন এই সামান্য অজ্ঞতাটুকু থেকে বের হয়ে আসতে দোষ কোথায়?
গ্রাম্য সংস্কৃতির বা কৃষকদের এটাই একমাত্র অনুষ্ঠান যেটা ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পালন করা হয়। এই অনুষ্ঠানের মর্মমূল হচ্ছে কৃষকদের নতুন ফসল ঘরে তোলা ও জমিদারদের কাছে ঋণমুক্ত হওয়ার আনন্দ। অথচ শহরের কয়জনই বা এই বিষয়ে অবগত থাকেন! জমিদারী প্রথা বিলোপের সাথে সাথে নগরে অর্থাৎ কৃষকদের মাঝে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করার আমেজ বেশ থিতিয়ে এসেছে। তবে বাংলা দিনপঞ্জিকার প্রথম দিন হিসাবে দেশের শিতি সমাজে এর কদর বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে।
বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে আমাদের ভেতরে আশার সঞ্চার করে বটে; কিন্তু একটু তলিয়ে এবং খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে আজকাল সবখানেই আমাদের সংস্কৃতি চর্চার নামে যা হচ্ছে সেটা হল তার বিকৃতিকরণভাষা থেকে শুরু করে পোশাক, সঙ্গীত, নৃত্যকলা, খাদ্যাভ্যাস সবখানেই। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি এখন ব্যবসায়ের পণ্যতে পরিণত হয়েছে। আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ বিশেষ কায়দায় প্রদর্শন করে সর্বচ্চ মুনাফা আদায় করছে বহুমুখী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো; টেলিভিশন ও প্রিন্টেড মিডিয়া রঙিন রঙিন ছবি পেশ করে কাটতি বাড়াচ্ছে বহুগুণে, ১০টি এস এম এস ফ্রি দেওয়া হচ্ছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য এমনই সত্ত্বা আবেগ আমাদের! আমি এসবের কোনকিছুকেই দোষের মনে করছি না। কিন্তু যখন ‘অতিরিক্ত’ ছাপিয়ে ওঠে ‘প্রকৃত’ আয়োজনকে তখন মাথা ব্যথা করে বৈকি।
সারাদেশে রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ এসো হে..’ গানের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার বাঙ্গালী পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেই। এখানে প্রকাশ পায় বাংলার স্বাধীন মানুষের প্রাণের উচ্ছ্বাস-এর বহিঃপ্রকাশ। সমসত্ম জাতি একই কাতারে সামিল হয়ে আনন্দ উদ্যাপন করে। আমাদের মত দরিদ্র-দুর্নীতিগ্রস্থ দেশে তো সেটা কল্পনা করাই আকাশ কুসুম চিন্তার সামিল। হাজার সমস্যায় জর্জরিত আমাদের জীবন প্রবাহ, সমাজ ও রাষ্টীয় ব্যবস্থা। এমন অবস্থায় পহেলা বৈশাখ প্রতি বছর সমগ্র বাঙ্গালীর দেহে এক চিলতে প্রাণের সঞ্চার করে। সারাদেশে তা বেশ স্পষ্ট। তবে বর্তমানে যা হয় তার সবটা কি আমাদের সংস্কৃতি ? ২০০১ সালে বোমা হামলা, প্রতি বছরই যত্রতত্র নারীদের ইভটিজিং এর শিকার হওয়া। আর ১০০-২০০ টাকা দরে এক প্লেট পান্তা-ইলিশ খাওয়া। চাইনিজ বা থাই না খেলে যে বাঙ্গালীদের আজকাল জাত রা হয় না, সে বাঙ্গালীদের বছরে এই একটি দিনে আয়েশ করে পান্তা ইলিশ ভণ করে বাঙ্গালিত্ব যাহির করার যে প্রয়াস তা আমাদের পূর্ব পুরুষদের দরিদ্রতাকে প্রচন্ডভাবে অপমান করে এবং হেয় করে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যত দিন যাচ্ছে পহেলা বৈশাখ উদযাপন তত বেশি আড়ম্বরময় হচ্ছে। তার মানে কি এই যে সময়ের পরিক্রমায় আমাদের বাঙ্গালিত্ব্ আরো প্রগাঢ় ও গূঢ় হচ্ছে? বোধহয় না। মিথ্যাকে যাহির করার জন্যই তো ঢাক-ঢোলের প্রয়োজন বেশি! আমরা যে আমাদের হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় অর্জিত সংস্কৃতি থেকে ক্রমান্বয়ে ছিটকে যাচ্ছি সেটা ঢেকে রাখার জন্যই এত বাদ্য পেটানো। আমার মনে হয় নিজের বিবেককে ঠেকানো ও ঠকানোর সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম এটা।
আমাদের সংস্কৃতির আচার ও অনুষ্ঠানগুলো যেদিন থেকে ফ্যাশন-এর কারণ হয়ে উঠেছে সেদিন থেকে শুরু হয়েছে আমাদের সংস্কৃতির সর্বনাশা রূপ। একটা জাতি যখন তাদের সংস্কৃতি ও লোকাচারকে বাইরে বের করে আনে তখন তাদের শূন্য অন্দরমহলে অন্যকোনও সংস্কৃতি গোপনে দানা বাঁধতে থাকে। আমাদের বুকের ভেতরটা নেড়ে-ঘেঁটে দেখা খুব জরুরী হয়ে উঠেছে। আমি আমাদের সংস্কৃতি চর্চার সবখানেই হতাশাব্যক্ত করছি না। আশার ব্যাপার হল, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই দেশ ও দেশের সংস্কৃতি নিয়ে ভাবছে। সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের হাত থেকে আমাদের সংস্কৃতিকে রা করতে তারা সদা তৎপর। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পহেলা বৈশাখের উৎসবমুখর উদযাপর তারই প্রমাণ বহন করে। পরিশেষে রবীন্দ্রনাথের মত বলতেই হচ্ছে, আমাদেরকে নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকে আপন করতে শিখতে হবে, অন্যথায় প্রকৃত মুক্তি মিলবে না।
আসুন, আমরা আমাদের অজ্ঞতাগুলো ঝেড়ে ফেলে নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে জানার চেষ্টা করি। নতুন দিনের নতুন সূর্যোদয়ে সকল বাঙালি জাতির কাছে অনুরোধ, বাংলা ভূখণ্ডের ইতিহাস ও রাজনীতির কথা মনে রেখে বাংলার অনুষ্ঠান হিসেবে পয়লা বৈশাখকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কেননা ইতিহাসের বাংলা বলতে এখানো অখণ্ডিত বাংলাকে বলা হচ্ছে। কারণ অখন্ডিত বাংলার সকল বাংলা ভাষাভাষীর অনুষ্ঠান পয়লা বৈশাখ। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দুটি পৃথক অংশ হলেও ভাষা আর সংস্কৃতি ঐতিহাসিক বাংলার বর্তমান বিভাজিত দুই অংশকে সেতু বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। পয়লা বৈশাখ শুধু দেশের একক কোন উৎসব নয়। কেননা এটি পঁচিশ থেকে ত্রিশ কোটি বছরের বাঙালিরই অনুষ্ঠান, তাইতে তাদের অধিবাস যেখানেই হোক না কেন। আমার বাঙালী জাতির দ্বি-বিভক্তি চাই না। হারাতে চাই না ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মিলন উৎসব। দাঁড়াতে চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি। ইতিহাসকে ফিরে পেতে চাই স্ব-মহিমায়। দেরযুগ আগে সামরিক শাষকের মৌলবাদী মানসিকতার সৃষ্টি দিন পঞ্জিকার ‘(বাংলাদেশ)’ ‘(ভারত)’ ভেঙ্গে ফিরে পেতে চাই বাঙালী জাতির এক আত্মা। ‘আমরা বাঙালি ছিলাম রে...’ এই গানটির মর্মকথা ধারণ করে এগিয়ে নিতে চাই না বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে। বাংলা নববর্ষ হোক বাঙালি জাতির মিলন উৎসব। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত্ব হোক-‘আমরা সবাই বাঙালী’।
লেখক ঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিককর্মী।

No comments:

Post a Comment