Pages

Monday, 3 June 2013

অনুভবে বৈশাখ



একটি ভূখণ্ড হঠাৎ জেগে ওঠতে পারে কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি হঠাৎ জেগে ওঠার মতো নয়। ‘বাঙালি’ নামক একটি জাতির ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অনেক পুরোনো, যা আজ বিভিন্ন স্থানে খনন করে প্রাপ্ত উপাদানসমূহ বলে দিচ্ছে। এদেশের মুগ্ধ প্রকৃতির পানে তাকিয়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা বলেন, কি সুন্দর এদেশের প্রকৃতিÑ মাঠ-ঘাট, অরণ্য, নদী-নালা, পাহাড়-পবর্ত। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে প্রকৃতি নিজের হাতে গড়ে তুলেছে বিশাল সবুজের সমারোহ।
কবি মাইকেল মধুসূদনের ঐতিহাসিক সাগরদাঁড়ি গ্রাম আর কপোতা নদ, কুষ্টিয়ার লালন ফকিরের বসতভিটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি বাংলাদেশের প্রান্তবর্তী জনপদ চট্টগ্রাম, যার কথা যুগে যুগে কবি-সাহিত্যকগণ এর বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন উপমায়, শৈল-কিরীটিনী, নদী-মালিনী ইত্যাদি বলে, প্রাচীন ‘বাকলা চন্দ্র দ্বীপ’ নামের বর্তমানের বরিশাল, পাঁচটি ,গড়ের সমষ্টি পঞ্চগড়, পুরোহিত ঠাকুর পরিবারের নামানুযায়ী ঠাকুরগাঁও, নীলচাষের কেন্দ্রভূমি নীলফামারী, রঙ্গ বা রেশম সুতার উৎপাদনের শহর রংপুর, বিপ্লবী কৃষক নেতা নুরুলদিনের ঘনিষ্ট সাথী ‘লালমনি’র নামের নামের লালমনিরহাট, প্রাচীন বাংলার মৌর্য ও গুপ্ত শাসনামলে ‘পুন্ড্রনগর’ বগুড়া, নাট্যপুর নামের নাটোর, রাজ ও শাহীর সম্মিলিত রাজশাহী, স্বাধীন বাংলাদেশের সূতিকাগার এবং অস্থায়ী রাজধানী ও ঐতিহাসিক মুজিবনগর মেহেরপুর, বাংলা মাঘ শব্দ থেকে মাগুরা, চাঁদ সওদাগর অথবা জমিদার চাঁদরায়ের নামের চাঁদপুর, কামালাঙ্ক তথা কুমিল্লাসহ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়-ই বিচরণ করলে দেখা যাবে বাংলার প্রাচীন জনপদ ও মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতিপ্রিয়তা ও ঐতিহ্যকে লালনের নমুনা।
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তবে আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। (তথ্য: উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে) দেশভাগ হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার বাংলা সংস্কৃতির ওপর কালো থাবা বিস্তারের ল্েয পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাকিস্তান সরকারের এই অন্যায় আচরণের জবাব দিতেই ‘ছায়ানট’ ১৯৬৫ সনের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ, ১৯৭২ বঙ্গাব্দ) রমনার বটমূলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে। বস্তুত এই দিনটি থেকেই ‘পহেলা বৈশাখ’ বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতির অন্যতম এক পরিচায়ক রূপ লাভ করে। ১৯৭২ সালে (১৯৭৯ বঙ্গাব্দ) ‘পহেলা বৈশাখ’ বাংলাদেশের জাতীয় পার্বন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের অণুসারী হিংস্্রহানাদাররা থামিয়ে দিতে চেয়েছিলো বৈশাখের আয়োজন। সেজন্যে বাংলা নববর্ষ উদযাপনকল্পে সমবেত মানুষের ওপর হয়েছিলো বোমা হামলা। কিন্তু বাঙালি শত বাধার মুখেও প্রতিবছর পালন করে যাচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘বাংলা নববর্ষ’ বা ‘পহেলা বৈশাখ’। বাঙালি আজ প্রমাণ করেছে তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতি। বাংলা সন, বাংলা গান, বাঙালি খাদ্য, অভিরুচি, আপ্যায়ন সবই তার নিজস্ব ঢংয়ে। এ জাতির রীতি-নীতি, কৃষ্টি-সংস্কৃতি একদমই অন্য জাতি থেকে পৃথক। বছরের শেষ দিনে যেমন দেখা যায় হালখাতা উৎসব, ঠিক তেমনি নতুন বছরের শুরুতে যখন দেখা যায় প্রাণখোলা আনন্দের বন্যা। তরুণীরা নতুন বছরের শুরুতে সাদা জমিনের লাল পাড় দেয়া শাড়ি পরে, তরুণ-যুবকরা ফতুয়া, পাঞ্জাবি পরে, শিশু-কিশোররা মেতে ওঠে মেলায় নানা রকমের খেলনার সামগ্রী নিয়ে। ঐতিহ্যপ্রিয় পান্তাভাত, ইলিশ মাছ ও বেগুণভাজি খাওয়ার ধুম পড়ে।
বাঙালি জীবনে বাধা-বিপত্তি থাকা সত্বেও, হিম্ কুহেলিকায় ঝরে যাওয়া গাছের পাতা, কোকিলের একটানা উদাসীসুর, মানুষের মনে যখন একরাশ কান্তি এসে ছুঁয়ে যায়, তখন বসন্তরাজ ধীরে ধীরে গাছে গাছে নব-কিশলয়ে, ফসলের মাঠে শস্য দানায় পূর্ণ করে মানুষের মুখে হাঁসি ফুটিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। নেমে আসে উৎসবের ঢল। মেলা বসে গ্রামে-গ্রামে। কত না বিচিত্র্য হাতের তৈরি দ্রব্য সম্ভার সে সব মেলায় বিক্রি হয়। সে সকল জিনিস দেখলে বাঙলার মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবন ধারার একটা স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। গ্রাম বাংলার এ মেলা যেন মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। মাটির পুতুল, খেলনা, পাটের তৈরি শিকা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখা, ঝিনুকের মালা, বাঁশের বাঁশি, পুঁতির মালা, রকমারি মিষ্টান্ন আরো কতনা অদ্ভূত-অদ্ভূত সব জিনিসের সমাবেশ ঘটে সে মেলায়। তাদের জীবন যেন খণ্ড-খণ্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতে কারুকাজে। মানুষ গরীব হতে পারে, দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে তারা জর্জরিত হতে পারে, কিন্তু এসব দুঃখ কষ্ট তাদের জীবনকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। ক্রমান্বয়ে নববর্ষের ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃত হয়। রূপান্তরিত হয় লোকজ উৎসবে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। আধুনিক জীবন-পদ্ধতির নানা উপাচারের সমারোহে খেরো খাতায় হিসাব রাখার প্রচলন এখন উঠেই গেছে। শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা আজ ভুলে যেতে বসেছি, সংস্কৃতির ধারক-বাহক ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই সব লোকজ খেলা, দাঁড়িয়া বাঁন্ধা, হা-ডু-ডু, ডাংগুলি, মোরগ যুদ্ধ অথবা নৌকা বাইচের মত সর্বজন প্রিয় উৎসব গুলি। ডিজিটাল ব্যানারে এ প্রজন্ম আজ আকাশ সংস্কৃতিতেই বিভোর। তবু বাঙালির চিরায়ত উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখে এলেই কৃষ্ণচুড়ার মত রাঙিয়ে যায় মানুষের জীবন। শিমূল-পলাশের মত মানুষের মুখে জেগে ওঠে রক্তিম হাসি। ঢ্যাম্ কুড়্ কুড়্ বাদ্যি বাজিয়ে যান্ত্রিক সভ্যতায় ভেসে বেড়ায় গ্রামীণ সজিবতা। শিশুর সারল্যে অনুভব করি বৈশাখী উন্মাদনা।
লেখক ঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিককর্মী

No comments:

Post a Comment