Pages

Monday, 3 June 2013

উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান

নদীমাতৃকদেশ বাংলাদেশ। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটি দ্বারা সৃষ্ট আমাদের এই জন্মভূমি। হাজার বছর ধরে সংগ্রাম করে জাতিসত্তা বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙালিরা। এই জাতি কখনোই সংস্কৃত, ফার্সী ও ইংরেজি ভাষার নিকট পরাজয়বরণ করেনি। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির আদর্শে উদ্ভাসিত সংগ্রামী বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হাজার বছর ধরে বাঙালিরা পরাধীন ছিল। পরাধীনতার গ্লানি মুছে দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাঙালির সম্মুখে মহানায়কের ভূমিকায় আর্বিভূত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণে তিনি সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল নিউজ উইক পত্রিকা বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ আখ্যায়িত করে। ব্যক্তি জীবনে শেখ মুজিব ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্নেহধন্য। সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন-‘মুজিব একদিন ইতিহাস সৃষ্টি করবে’। শেখ মুজিব ছিলেন বিদ্রোহী বাংলার মূর্ত প্রতীক।
শেখ মুজিবুর রহমান আইয়ুব খানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাঙালির মুক্তি সনদ-ছয় দফা ঘোষণা করেন। এজন্য তাঁকে দীর্ঘদিন কারাবাস করতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলে। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে তিনি মুক্তি লাভ করেন। আটক অবস্থায় তাঁকে প্যারোলে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের আহ্বান জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। একজন মুক্ত মানুষ হিসাবে তিনি লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। ছয় দফার প্রশ্নে তিনি অনড় ছিলেন। তাঁর ছয় দফা দাবি না মানার কারণে আলোচনা ভেঙ্গে যায়। ১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বঙ্গবন্ধুর বিজয় হয়। সামরিক শক্তির পরাজয় ঘটে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। যার যা আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে আলোচনা ভেঙ্গে যায়। ২৫ মার্চ পাক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর আক্রমণ চালায়। প্রতিবাদে ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন। পাকিস্তানী স্বৈরশাসক তাঁকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে আটক রাখে। বিচারে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। তবুও তিনি পাকিস্তানীদের সাথে কোন আপোষ করেননি। তাঁর অবর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। ভারত-রাশিয়া বাংলাদেশ সরকারকে সবরকমের সহযোগিতা দেয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকায় মিত্রবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসাবে বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি মুক্ত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে প্রণীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। এ সংবিধানের মূলনীতি ছিল-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।
ঘাতকদের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু রক্ত দিয়ে মাতৃভূমির ঋণ পরিশোধ করেন। ঘাতকদের নির্মমতা কারবালার হত্যাকাণ্ড ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার হত্যার ঘটনাকেও ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘ ২১ বছর পর্যন্ত হত্যার বিচার হয়নি। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে পিতা-মাতা-ভাই ও আত্মীয়-স্বজনদের হত্যার বিচার সমাপ্ত করেন। পাঁচ খুনীর ফাঁসি হয়েছে। এখনো ছয় খুনী পালিয়ে আছে।
আজ জাতির জনক হত্যার দিন পনেরই আগস্ট। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমাদের অতীত ইতিহাসের অনেক কিছুই অজানা। তারা জানতে চায়। বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক-কেবলই কী নির্বাচিত শব্দ মাত্র? তা তো' নয়। তবে কেন সরকার পরিবর্তন হলেই অবমূল্যায়িত হতে থাকেন বঙ্গবন্ধু? যদি হাজার বছরের বাংলার উজ্জ্বলতম দুই জ্যোতিষ্ক পুরুষের কথা বলতে হয়, তাহলে শতাব্দীর প্রথমার্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অপরার্ধে শেখ মুজিবুর রহমান।
রবীন্দ্রনাথ প্রায় দ্বাদশবর্ষকাল বসবাস করেন বাংলাদেশের হৃদয়-ভূমিতে। পদ্মা
-আত্রাই, ষড়ঋতুর বিচিত্র বিভঙ্গ, ছোটো ছোটো গ্রাম আর ছোটো ছোটো সুখ দুঃখের গ্রামীণ মানুষ উঠে এসেছে তাঁর গানে কবিতায় গল্পে। দেশটিকে তিনি নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করেছিলেন, নাম-‘সোনার বাংলা’।
আরেক মহৎ পুরুষ, তিনি অবশ্য সাহিত্যের মানদণ্ডে কবি নন, তিনি রাজনীতির কবি। তিনি নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, নির্মাতা এবং স্বপ্নদ্রষ্টা। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলি কাটিয়েছেন রাজনৈতিক নির্যাতনে, কারান্তরালে। শতাব্দীর বিশেষ এক ক্রান্তিকালে বিশ্বের সবচাইতে আলোচিত ঐ ব্যক্তিত্ব আমাদেরই ঘরের শেখ মুজিব। দু'য়ের মাঝে মিল খুঁজে পাই। মুজিবের আন্দোলন-সংগ্রামের উদ্দিষ্ট যে স্বপ্নের দেশ, কেমন করে সে দেশ এসে মিশে গেছে রবীন্দ্রভাবনার সাথে। সেই ঠিকানা 'সোনার বাংলা'। কবিতা-গান আর স্বপ্ন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত শেষ সত্য-১৯৭১-এ বিশ্বমানচিত্রে এক নবীন রাষ্ট্র, নাম তার বাংলাদেশ।
স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনীর বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে, যখন শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগারে। তাঁর প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সেই কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁর দেশবাসীর উত্তাল আনন্দধ্বনির মধ্যে ঢাকায় এসে নামেন। সেই ১০ই জানুয়ারিতে তিনি সোনার বাংলাকে মুক্ত হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তাঁর নিজের আন্দোলনকে ষাট বছর আগে শুরু হওয়া আরেক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে উদ্ধৃতি দেন রবীন্দ্রনাথের ১৯১১ সালে লেখা একটি কবিতা থেকে। সেটা ছিল মুজিবের জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন, এমন একটা দিন যেদিন স্বাধীনতার জন্যে নিবেদিত একটি জীবন তার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছিল, যেদিন ১৯০৫-১২ কাল পর্যায়ের ঘটনাবলী বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছিল বাংলার হাতে। শেখ যখন রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা থেকে উদ্ধৃতি দেন, জনতা তখন গেয়ে ওঠে-
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥
লেখক ঃ অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী।

No comments:

Post a Comment