Pages

Monday, 3 June 2013

কতটুকু ভাল আছে আমার দেশের শ্রমিক


এসেছে ১ মে। এসেছে পর্যালোচনা করার সময়। বিশ্বায়নের এই সময়ে কতটুকু ভাল আছে আমাদের দেশের শ্রমিক সমাজ। পর্যালোচনা করার পূর্বে আমাদের বোঝা দরকার, শ্রমিক বলতে আমরা কি বুঝি? যদিও আমাদের সমাজে শুধুমাত্...র কল-কারখানা, রিক্সা চালক , বিভিন্ন গোডাউনে যার কাজ করেন, তাদেরকেই শ্রমিক হিসাবে চিহ্ণিত করেন সামাজের বিজ্ঞ কলামিষ্ট ও প্রচার মাধ্যম গুলো। আসলে কি তাই! যার সাংবাদিক. লেখক, সঙ্গীত, মডেলিং, অভিনয়-এর মতো শিল্পের সাথে যুক্ত হয়ে অন্ন যোগাচ্ছে তারা কি শ্রমিক নয়! যে সকল প্রতিষ্ঠান এ সকল শিল্পী শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে আয় করছেন ল-ল টাকা, তারা কি মানুষের শ্রম বিক্রি করছেন না! তাহলে পেশাদার শিল্পীদের শ্রমিক বলতে বাধা কোথায়? আমার মনে হয়, সমাজের মুনাফালোভী স্বার্থনেষী কতিপয় মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার মানসে শিল্পীদের শ্রমিক বলতে কুণ্ঠিত। শিল্পী সমাজ নিয়ে এক জরীপে দেখা যায়, এই সম্প্রদায় একটু ভাবুব প্রকৃতির মানুষ হিসাবে সমাজে পরিলতি। উদার মনোভাবাপন্ন মানষিকতায় তাদের পথ চলা। তারা তাদের শিল্পকর্মের মাধ্যেমেই প্রতিবাদের ভাষা ব্যক্ত করেন। যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয় না। এই সম্প্রদায় হরতালের মত বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিনিময়ে প্রতিবাদ জানাতে চান না। সমাজের তিসাধিত কোন কর্মকাণ্ডই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আর এ কারণেই তাদের সরল্যতাকে পুঁজি করে ন্যায্য অধিকরা থেকে বঞ্চিত করছে স্বার্থানেষী প্রতিষ্ঠান গুলো। বলাবাহুল্য, বর্তমানে একাধিক এনজিও, বিভিন্ন নামধারী এ্যাডভ্রাটাইজিং প্রতিষ্ঠান গুলো দেশের তৃণমূল থেকে সঙ্গীত, নৃত্য, যন্ত্রি, অভিনয় শিল্পীসহ বিভিন্ন প্রতিভায় প্রতিভাবানদের এনে চাকুরী নামে তাদের শৈলপিক শ্রমকে বিক্রি করে লুফে নিচ্ছে ল ল টাকা। আর ঐ প্রতিভাবান শ্রমিকদের দেয়া হচ্ছে সামান্য পারিশ্রমিক, কিন্তু তাদের খাটিয়ে নেয় হচ্ছে দৈনিক-‘গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা’। এমন কি সরকারি ছুটিও তারা ভোগ করতে পারেন না। আর এ জন্য প্রতিষ্ঠান গুলোর বরাদ্দ নেই অতিরিক্ত পারিশ্রমিক। যে মে দিবসকে কেন্দ্র করে এত আলোচনা, সেই মে দিবসেও এহেন শ্রমিকরা তাদের শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছেন প্রতিষ্ঠান গুলোর কর্মপন্থার নিয়মাবলীতে। অথচ দিবস এলেই সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত নামধারী প্রতিষ্ঠান গুলো শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। আলোচনার টেবিল ভেঙে ফেলেন প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে। অথচ তাদের গৃহেই নেই শ্রম অধিকারের ন্যায্য হিসাব। আলোচনার ময়দানে তারা শিকার করতে রাজী নন, শৈলপিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও শ্রমিক। কিন্ত তার শিকার করুন বা না-ই করুন এটাই সত্য, শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করাটাই হচ্ছে শ্রমিক হবার মূল কথা।
এবার আসা যাক মে দিবস পালন প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে মে দিবস শুধু কর্পোরেটদের বিজ্ঞাপনেই পালিত হয়, এখনো আমরা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ অমানবিক শ্রমের কাজে যাওয়া রুখতে পারিনি। তৃতীয় বিশ্বের একটি অতিদরিদ্র দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে দেশটি বৃহৎ হলেও মানবসম্পদ উন্নয়নের দিক থেকে আমাদের দেশের অবস্থান দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বনিম্ন। এদেশের কর্মম জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেকার, বৃদ্ধি পাচ্ছে শিতি বেকারের সংখ্যা। মুখে বহু কথা বলা হলেও কার্যত এখানে শ্রমশক্তি পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগানোর জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এক পোষাক শিল্প বাদে এখানে অন্য কোন শিল্প তেমনভাবে বিকশিত হয়নি, বিদেশী আগ্রাসনে তা বিকশিত হতে দেওয়া হয়নি -এটাই সত্য। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পরে ‘সোনালী আঁশ‘ খ্যাত পাট শিল্পের কথা। আমাদের সম্ভাবনাময় পাট শিল্পকে ধ্বংস করা হয়েছে সুকৌশলে, কোন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ছাড়াই একের পর এক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে পাটকলগুলো। আর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পাটকলগুলো লোকসানে রেখে সরকার তা চালাতে পারবে না। অথচ, রাষ্ট্রের বিজ্ঞ ব্যক্তিরা কি দেখছেন না, ল-ল শ্রমিকের বেকারত্ব? তারা যদি বছরের পর বছর ধরে লোকসানে চলা কলগুলো লাভের দিকে অগ্রসরের জন্য যুগোপযোগী ইতিবাচক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, তাতে বাঁচতো একটা বৃহৎ শিল্প, সমৃদ্ধ হতো স্বদেশ, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেত মানুষ।
যখন অন্য কোন শিল্প এদেশে বিকশিত হয়নি, বা হতে দেওয়া হয়নি। এমনি এক সময়ে বিকাশ ঘটে পোষাক শিল্পের, পোষাক শিল্প বিকাশের পেছনে প্রধান যেদিকটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, তা হলো ন্যূনতম অথবা নামমাত্র মূল্যে অধিক শ্রম, যা সম্ভবতঃ বর্তমান পৃথিবীতে সর্বনিম্ন। গ্রামের মানুষ তার সহজাত জীবন-ধারায় চলতে না পেরে দু‘মুঠো অন্নের আশায় পারি জমায় শহরে; আর এরাই মূলতঃ পোষাক শিল্পের শ্রমের জোগানদাতা।
একটু ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের মাত্র ৫০টির মতো কারখানা ছিল, যা বর্তমানে লাধিক। আর এথেকে শ্রমিকের সংখ্যাটাও ধারণা করা যায়। এই শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী শ্রমিক। তাই শ্রমিক অধিকারের কথা বললে পোষাক শ্রমিকদের দুর্দশার চিত্রটিই আমাদের সামনে ফুটে উঠে। বিভিন্ন সময় গার্মেন্টস শিল্পে অগ্নিকাণ্ড, বিল্ডিং ধ্বস- এর মতো মর্মান্তিক দূর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে, আহতের সংখ্যাও কম নয়। কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে- শ্রমিকদের কি সে হিসাবে তিপূরণ দেয়া হয়েছে? সম্প্রতি সাভরে রানাপ্লাজা ধ্বসে নিহতদের পরিবারের হাতে একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য হিসাবে দেয়া হয়েছে মাত্র (২০,০০০) বিশ হাজার টাকা! মানবিক কারণেই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের অতি নিম্নআয়ের একটি অংশই এ কাজে জড়িত। সেই নিম্নআয়টিও শ্রমিক ঠিকমতো পায় না; উপরন্তু, তাকে দিয়ে ৮ ঘন্টার স্থলে যখন ১২-১৬ ঘন্টা পর্যন্ত খাটানো হয় কোন ওভার টাইমের বালাই ছাড়াই, অসুস্থ শ্রমিককে ন্যূনতম চিকিৎসাটুকুও দেয়া হয় না, তখন রাজপথে নামা ছাড়া শ্রমিকদের কিইবা করার থাকে! অথচ এই অধিকারটুকু অর্জনের জন্যই ১৮৮৬ সালে শিকাগোয় নিজেদের অধিকার আদায়ের ল্েয অন্দোলন করে ছিল শ্রমজীবি মানুষ।
১০ থেকে ১২ ঘণ্টার শ্রম কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনার আকাংখা ছিল শ্রমিকের দাবী। ৮ ঘণ্টা হোক কাজের সময়। এই ছিলো তাদের চাওয়া। তৎকালীন তারা সময় বেঁধে দিয়েছিলো ১ মে এর মধ্যে তাদের দাবি মেনে নিতে হবে। কিন্তু কারখানার মালিকরা তা মেনে নেয়নি। ৪ মে ১৮৮৬ সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। তারা ১৮৮৬ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন। “অগাস্ট স্পীজ” নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। পুলিশবাহিনী তৎনাত শ্রমিকদের উপর অতর্কিত হামলা শুরু করে যা রায়টের রূপ নেয়। ১১ জন শ্রমিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পুলিশ হত্যা মামলায় অগাস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে জনসমে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ছয় বছর পর ২৬শে জুন ১৮৯৩, ইলিনয়ের গর্ভনর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন এবং বিচারে রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। অগাস্ট স্পীজসহ নিহত শ্রমিকদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের সেই আত্মত্যাগের ফলেই যুক্তরাস্ট্রের শিল্প মালিকেরা শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবী মেনে নিয়েছিলেন। তখন থেকে পুঁজিবাদী বিশ্বে এই দিনটি নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য না হলেও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ঘটা করে পালন করা হয় মহান মে দিবস।
সকল শ্রমজীবি মানুষের অধিকার এবং নিরাপত্তার দাবী আদায়ে যথোপযুক্ত পদপে নেয়া এখন সময়ের দাবী। শুধু একদিন এই ১লা মে’ই নয়, বছরের সেই সব নিয়মিত দিনে যেসব সময় আমরা তাদের সাথে সম্পর্কিত থাকি অথবা থাকিনা সকল সময়েই আমাদের মানবিক বোধের সর্বোচ্চ অনুভূতিগুলো জেগে উঠুক এবং সমাজ রাষ্ট্র পৃথিবী হোক সংকটহীন আবাসযোগ্য একটি বাসস্থান।
অপর্ণা সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী

No comments:

Post a Comment