Pages

Tuesday, 4 June 2013

ইভটিজিং প্রতিরোধে পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে করণীয়

                                                                   -অপর্ণা সাহা

টিজিং কথাটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পরিশ্বাস, জ্বালাতন করা। প্রচলিত এই শব্দটির শাব্দিক প্রতিশব্দ উত্ত্যক্ত করা। ইভটিজিং-এর অর্থ সীমিত নয় বরং উত্ত্যক্ত করার আড়ালে যৌন প্রবৃত্তির মোড়ক উন্মোচিত করা। লম্পট চাহনী, অশ্লীল মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি, শিস ও উস্কানিমূলক তালি বাজানো, গায়ে ধাক্কা দিয়ে অসম্মতিতে অঙ্গ স্পর্শ, পিছু নেওয়া, মুঠোফোনে অশ্লীল ম্যাসেজ ও ছবি পাঠানোসহ ইত্যাদি ।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে, অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশে প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান চাইল্ড পার্লামেন্ট ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১০ প্রকাশিত এক সমীায় জানিয়েছে, বাংলাদেশ স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের মধ্যে ৬২ শতাংশ ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছে। সংগঠনটি দেশের ৬৪টি জেলার ৫১১টি স্কুলে খোঁজ নিয়ে এ তথ্য দিয়েছে। এদের তথ্যের সমর্থন মেলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রিপোর্টে। তার বলছে, দেশে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ইভটিজিংয়ের ঘটনা ঘটে থাকে শিা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে।

ইভটিজিং রোধে করণীয় ঃ
ইভটিজিংয়ের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবার কেউ এককভাবে দায়ী নয়, সমষ্টিগতভাবে আমারা সকলে দায়ী। কেননা ইভটিজার বা অপরাধী হয়ে কেহ জন্মায় না। একটি সুন্দর পরিবারের সুন্দর শিশু বড় হতে হতে এক সময় তার পদস্খলন হয় কেন? তার বীজটা পরিবারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, সমাজেই তার শেকড় প্রোথিত থাকে। পরিবারের সেই বীজটা ধ্বংস করতে হবে, সমাজের সেই শেকড়টা উপরে ফেলতে হবে। এ ব্যাধি নির্মূল করতে আইন সহায়ক শক্তি হিসাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে ; কিন্তু নির্মূল করতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সুস্থ মানসিকতার বিকাশ। একে প্রতিহত করতে সমাজ ও পরিবারের করণীয় বহুবিধ।

পরিবার ঃ     পরিবার মানব জীবনের সবচেয়ে বড় শিা কেন্দ্র। আর পিতা-মাতা প্রতিটি সমাজবদ্ধ জীবের সবচেয়ে বড় ও প্রধান শিক। এখানে তার চরিত্র যেভাবে গঠিত হবে ভবিষ্যৎ জীবনে তাই বড় হয়ে দেখা দেবে। কেননা আচরণ হচ্ছে মানুষের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য এবং তার জন্ম পরবর্তীকালে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পারস্পরিক ক্রিয়া। এ কারণেই মা-বাবা এক হওয়া সত্ত্বেও এক সন্তানের সঙ্গে আরেক জনের আচরণের মিল থাকে না। জন্মসূত্রে মানুষ যে বৈশিষ্ট্য ধারণ করে তাকে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত করতে পারে তার পরিবার ও পরিবেশ। যেমন, একটা শিশু জন্মের পর থেকেই দেখতে থাকল যে তার বাবা-মা প্রচণ্ড ঝগড়াটে। একজন আরেক জনকে মোটেও সহ্য করতে পারে না। কিংবা তার পরিবারের মধ্যে কেউ এমন আছে যে নাকি অনৈতিক কাজের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাহলে ওই শিশুটি কি নিজেকে জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য ঠিক রাখতে পারবে? কখনই পারবে না। পরিবারের সদস্যদের আচরণগত যে ত্র“টি তা শিশুরা তার অভিভাবকদের কাছ থেকে শিখে নিচ্ছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শিশুরা যা দেখে তা সত্য বলে মনে করে এবং বড়দের অনুকরণ করে।

আবার একই পরিবারের দুটি সন্তান পুত্র ও কন্যা, মা-বাবার ভালবাসা কন্যা সন্তানের চেয়ে পুত্রের উপর বেশি। জন্মের পরই নারী-পুরুষের বৈষম্য তার পরিবার থেকেই স্বীকৃত। জন্মসূত্রে পারিবারিকভাবে সৃষ্ট এই বৈষম্য পরিবারকেই দুর করতে হবে। কেননা এই বৈষম্যের কারণে নারী ছোট থেকে জানতে থাকে, সে কামের বস্তু, প্রেমের নয়, একারণে প্রতিবাদী হতে জানেনা। নরও ছেলেবেলা থেকে জানতে থাকে তার জন্মই ভোগ করার জন্য।

প্রতিযোগিতামূলক জীবনে মা-বাবা সন্তানকে যথোপযুক্ত সময় দিতে পারেন না তেমন। ফলে সন্তান মা-বাবার ভালবাসা সঠিক ভাবে পায় না। ভালবাসা না পাওয়ায় এই ঘাটতি, তার প্রভাব পরে সন্তানের চরিত্র গঠনে। ভালবাসা যে পায় না, সে নিজেও কিন্তু ভালবাসতে জানেনা। ফলে যে কিশোরটি ভালবাসা কি জিনিস জানে না, সে অন্যকে ভালবাসতে পারে না। নিজের খেয়াল খুশী মত আচরণ করে। সে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে উত্ত্যক্ত করতেই পারে। যে কিশোরটি নিজের বোনকে শ্রদ্ধা করতে শিখল না, সে অন্যের মেয়েকে কেন শ্রদ্ধা করবে?

এছাড়া মানুষের বয়ঃসন্ধিকালে শরীরে পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক ধরণের উৎসুক মানসিকতাও বিকাশ লাভ করে। তার মনে সব সময় নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়। সে জানতে চায়, তার মধ্যে যে কৌতুহল জন্ম হয় তার জবাব। কিন্তু পরিবারের কঠোরতা, শাসনের বেড়াজাল, কুসংষ্কারমূলক আচরণ স্বাভাবিকভাবেই তার পরিবারের কাছ থেকে জানার প্রত্যাশা হারিয়ে ফেলে।
ভ্রান্ত ধারণা লালন করে তারা প্রতিনিয়ত। সেই ভ্রান্ত ধারণা পুঞ্জীভূত হয়ে ইভটিজিংয়ের মত সমাজ ধ্বংসকারী কার্যকলাপের মানসিকতার সৃষ্টির কারণ হয়। এ কারণে সন্তানের সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক হবে আস্থা ও বিশ্বাসের। তার ব্যতয় ঘটলে সন্তান তার মা-বাবার ও পরিবারের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সন্তানের সঙ্গে প্রতিটি পরিবারের সম্পর্ক হতে হবে বন্ধুর মতো।


সমাজঃ     
(১) বাঙালী সংস্কৃতি চর্চা পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় অতিমাত্রায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সমাজভিত্তিক সংস্কৃতি চর্চায় তারুণ্য খুঁজে পেতে পারে পথের দিশা, আত্মমুক্তি ও পাপাচার থেকে দূরে থাকার আত্মিক শক্তি। আজ দেশে অনেক মিডিয়া, অনেক চ্যানেল, কাগজ, মুঠোফোন, গৃহফোন, কম্পিউটার আরো কত কী! কিন্তু নেতৃত্ব নেই, নেই সমন্বয়ের অব্যর্থ শক্তি। যে কারণে প্রতিযোগিতার ঢেউ-এ জাতীয় কর্মকাণ্ডে রমরমা ভাব, টানটান উত্তেজনা থাকে বটে, থাকে না আত্মনিবেদন, থাকে না এক সঙ্গে এগোবার প্রতিযোগিতা।
 
(২) তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক চর্চা রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা একান্ত জরুরী।

তথ্য প্রযুক্তির কারণে আমাদের এখানে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সুযোগ এসেছে, আর অপসংস্কৃতি জেঁকে বসেছে তারই হাত ধরে। সামাজিকভাবে লুটেপুটে খাওয়ার জন্য যারা উদগ্রীব তাদের এ েেত্র বড় একটা ভূমিকা থাকে। সাধারণত মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করার জন্য তারা নানা কৌশল অবলম্বন করে প্রতিনিয়ত, যার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের সমাজ।
 
(৩) বেকারত্ব দূরীকরণে সমাজকেই ইতিবাচক ও গঠনমূলক দায়িত্ব নিতে হবে।

বেকারত্ব কবলিত তরুণরা নীতিহীন ও আদর্শহীন হয়ে যৌন অনাচারসহ নানা রকম অনাচার, ভ্রষ্টাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতায় মেতে ওঠে। তাদের সে পথ থেকে সুস্থ ও দায়িত্বশীল পথে ফিরিয়ে আনার সকলের কাম্য।
 
(৪) সমাজের সন্দেহ প্রবণ দৃষ্টিভঙ্গীর আমল পরিবর্তন প্রয়োজন।

নারী-পুরুষের প্রকাশ্য হাত ধরাধরিকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী অপরাধ বিবেচনা করে। স্বামী-স্ত্রী হাত ধরে হাঁটবেন, পার্কে বসে গল্প করবেন-এ যেন মহালজ্জার কথা! তাই পার্কে বসে কোন পূর্ণবয়স্ক নর-নারী গল্প করছেন দেখলেই ধরে নেওয়া হয় তারা বিবাহিত নন, হয়তো পরকীয়া প্রেম করছেন। দু’জন ছাত্র-ছাত্রী পরপর দুই দিন গল্প করলে ধরে নেওয়া হয় তাদের সম্পর্ক বিশেষ পর্যায়ের।
 
(৫) খোলামেলা পরিবেশে শিশুদের বয়ঃবৃদ্ধি নিশ্চিতকরতে করতে হবে।

গ্রামের শিশুরা যেভাবে খোলামেলা পরিবেশে বেড়ে ওঠে শহরের শিশুরা সে সুযোগ পায় না। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত এক সঙ্গে চলাফেরা করার সুযোগ পায়। তারা উন্মুক্ত থাকে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গী থাকে মুক্ত। মুক্তমনা হওয়ায় সেখানকার কিশোরদের মধ্যে ইভটিজিং জাতীয় অনাচার খুবই কম। আর শহরের শিশুদের চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। শহরের মানুষের স্বাধীনতা নেই, কৃত্রিম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে তারা। ফলে তাদের অনুভূতিগুলো আত্মকেন্দ্রিক হয়। সে সব কিশোর ইভটিজিংয়ের মত কাজ করতে দ্বিধা করে না।
 
(৬) শিক্ষায়তনে শিশু শিক্ষা থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত আইন বিষয়ক পাঠ্য পুস্তক বাধ্যতামূলক করতে সমাজকে উদ্যোগ নিতে হবে।

জন্মসূত্র থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ আইনী বিষয় অনভিজ্ঞ থাকে। যে কারণে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস তাদের জন্মায় না। সে কারণেই অসামাজিক কার্যকলাপে কিশোরদের মনে কোন প্রকার ভিতির কাজ করেনা।
 
 (৭) কোন ব্যক্তির দিকে অহেতুক তাকিয়ে থাকা বা বারবার তাকানো সামাজিক ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং এটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধে চিহ্নিত কওে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে নারী এখন পুরুষের মতই অর্থনৈতিক শক্তির জোগানদার। দেশের বার্ষিক জাতীয় আয়ের উল্লেখযোগ্য হিস্যা সৃষ্টি হয় নারীদের হাতে। কোন কারণে এতে ঘাটতি পড়া মানেই দেশ অর্থনৈতিক অবনতির পথে যাওয়া।

সামাজিক অসচেতনতা ও পারিবারিক অসুস্থ মানসিকতা ধবংস করতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ। সমাজ-পরিবার তথা সমগ্র জাতিকে আন্তরিকতার বন্ধনে প্রতিহত করতে হবে ইভটিজিং নামক এই ব্যাধি। মনে রাখতে হবে ১৮ বছরের নীচে সকলেই শিশু হিসাবে বিবেচিত। সেই শিশুর বিরুদ্ধে ইভটিজিংয়ের সাজার দাবী বা আইনী লড়াই আজ না হোক আগামীকাল ভাবিয়ে তুলতে পারে।
লেখক ঃ সাংস্কৃতিক কর্মী।

No comments:

Post a Comment