Pages

Wednesday, 31 July 2013

হাড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঢেঁকি

হাড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঢেঁকি

                                                                  -অপর্ণা সাহা

‘ও ধান বান্ধি রে, ঢেঁকিতে পাড় দিয়া-
আমি নাচি ঢেঁকি নাচে হেলিয়া-দুলিয়া-
ধান বান্ধি রে’...
এ লোক গানের মধ্য দিয়ে ঢেঁকির সঙ্গে শেকড়ের সম্পর্ককে বোঝা যায়। নিরূপণ করা যায় গ্রাম্য জীবনের একটি সময়কে। বোঝা যায় গ্রাম্য মানুষের সঙ্গে ঢেঁকির সম্পর্ককে। বাংলাদেশ ভূমিকেন্দ্রিক সভ্যতার দেশ। শস্য উৎপাদনের ওপর নির্ভর ছিল এ অঞ্চলের অর্থনীতি। শস্যকে বিক্রিপোযোগী করতে যেসব বস্তুর ব্যবহার খুব বেশি করা হতো তার মধ্যে প্রধান ছিল হামানদিস্তা, হাত ঢেঁকি ও ঢেঁকি। এর মধ্যে ঢেঁকি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। দুুু’জন ঢেঁকিতে একই ছন্দে পাড় (ধাক্কা ) দিতো। সামনের গর্তে (লোটা ) ধান দিয়ে একজন ধানকে উল্টে-পাল্টে দিত (ওলাইয়া দেয়া বলা হতো)। ঢেঁকির ছন্দে অনেক গান গাওয়া হতো। মূলত ক্লান্তি নিবারণের জন্য এসব গান গাওয়া হতো। ঢেঁকির বিভিন্ন অংশের নাম ছিল। যে দুখণ্ড কাঠের গুঁড়ির ফাঁকে  ঢেঁকিকে স্থাপন করা হতো তার নাম-কাতলা (স্থান ভেদে ), ঢেঁকির যে অংশটি ধান ভানার কাজ করত বা লোটায় আঘাত করত তাকে বলা হতো-মোনাই। মোনাইর মাথায় লোহার গোলক স্থাপন করা থাকত তাকে বলা হতো-গুলা। ঢেঁকির শব্দে এখন আর মুখরিত হয় না পাড়া। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে ঢেঁকির পরিচিতি। দূরে কোথাও হয়তো ঢেঁকির দেখা মেলে কিন্তু তা এখন অন্ধের হাতি দর্শনের মতো। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো চোখের নিমেষে হারিয়ে গেছে গ্রাম জীবনের এক সময়ের উল্লেখযোগ্য উপজীব্য ঢেঁকি। কয়েক বছর আগেও গ্রামের চিত্রটা ছিল অন্যরকম। বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই ঘন অন্ধকার নেমে আসত গ্রামে। ঝাড়-জঙ্গল থেকে ভেসে আসত ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। তার সঙ্গে সংযোজিত হতো আরো একটি শব্দ। শব্দটি ঢেঁকির। কারণ সন্ধ্যার পরই গ্রামের নারীরা দল বেঁেধ কুপি জ্বালিয়ে ঢেঁকিতে চাল কুটত। এখন এ দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। বিদ্যুৎ এসেছে, বদলে গেছে গ্রামের রূপ। এখন আর অন্ধকারের চুল এলিয়ে দিয়ে সন্ধ্যা নামে না। নেমে আসে না, ডাকে না ঝিঁ ঝিঁ পোকা। ঢেঁকির শব্দও আধুনিকতার হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ঘরের পাশেই গড়ে উঠেছে রাইস মিল। সেখানে মানুষের দীর্ঘ লাইন। সময় কম, দ্রুত কাজ সারা যায়। যন্ত্রসভ্যতা অগ্রগতির ধাক্কায় ছিটকে পড়েছে আমাদের গ্রাম্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির অনবদ্য উপকরণ ঢেঁকি। এক সময় নতুন ধান বাড়িতে তোলার সঙ্গে সঙ্গে বিরাজ করত এক উৎসবমুখর পরিবেশ। গ্রামের এ সময় ঢেঁকি চালানোর প্রতিযোগিতাও শুরু হতো কখনো সখনো। পালাক্রমে দু’জন দু’জন করে ঢেঁকি চালানো হতো। এ সময় গ্রামের নারীদের মুখে চলত পাড়া মাতানো গান। বিরামহীনভাবে ঢেঁকির মাধ্যমে ধান থেকে চাল বানানোর যেন এক উৎসবে মেতে উঠত গ্রামের নারীরা। ঢেঁকিছাঁটা নতুন চালের গন্ধে নারীরা নিজেদের শারীরিক পরিশ্রমের কথা ভুলে যেত। অপেক্ষা থাকত কখন তৈরি হবে বাহারি পিঠা, পায়েস ও ঢেঁকিছাঁটা চিড়াসহ নতুন ধানের বিভিন্ন খাদ্য সম্ভার। ওই সময় গ্রামের অসহায় মহিলাদের ঢেঁকি ছিল একমাত্র আয়ের উৎস। কালের বিবর্তনে বিলীন হয়ে গেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকি। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও এখন ঢেঁকি চালানোর শব্দ শোনা যায় না। প্রত্যন্ত গ্রামেও রাইস মিল গড়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি।

No comments:

Post a Comment